আন্তর্জাতিকসর্বশেষ

বিধ্বস্ত বাড়িতে ফিরছেন বাস্তুচ্যূত ফিলিস্তিনিরা

নিউজ ডেস্ক
এনভি টোয়েন্টিফোর ডটকম
১১ অক্টোবর, ২০২৫

যুদ্ধবিরতি শুরুর পর উত্তর গাজায় নিজ ঠিকানায় ফিরছেন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি। গাজায় টানা দুই বছর ধরে ইসরাইলের নৃশংসতা ও গণহত্যার পর অবশেষে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, উপত্যকাটির নির্দিষ্ট এলাকা পর্যন্ত সেনা সরিয়ে নিচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। যুদ্ধবিরতির খবর জানান পরই নিজেদের বিধ্বস্ত বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা। সূত্র: রয়টার্স ও আল-জাজিরা
মিসরের পর্যটন শহর শারম আল শেখে আলোচনার সময় গত বুধবার হামাস ও ইসরাইল এই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। দীর্ঘ বৈঠকের শেষে গতকাল শুক্রবার ভোরে চুক্তিটির অনুমোদন দেয় ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা। পরে ইসরাইলের সামরিক বাহিনী জানায়, স্থানীয় সময় গতকাল দুপুর থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গাজার নির্দিষ্ট এলাকা পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর অবস্থান সরিয়ে নেবে ইসরাইল। আর ৭২ ঘণ্টা-অর্থাৎ সোমবার দুপুর নাগাদ গাজায় এখনো বন্দী থাকা জীবিত সব জিম্মিকে মুক্তি দেবে হামাস। এরপর ইসরাইলের বিভিন্ন কারাগারে বন্দী প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেওয়া হবে।
গাজায় সংঘাত বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি যে ২০ দফা ‘শান্তি পরিকল্পনা’ ঘোষণা করেছিলেন, তার প্রথম ধাপ বলা হচ্ছে এই যুদ্ধবিরতিকে। ওই পরিকল্পনা নিয়ে সোমবার থেকে মিসরে হামাস ও ইসরাইলের পরোক্ষ আলোচনা চলছিল। আলোচনায় হামাসের সঙ্গে ফিলিস্তিনি সংগঠন ইসলামিক জিহাদ ও পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইনও (পিএলএফপি)এর প্রতিনিধিরাও যোগ দিয়েছিলেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় টানা নৃশংস হামলা ও গণহত্যা চালায় ইসরাইল। এর মধ্যে মাত্র দুই মাসের কিছুটা বেশি সময় যুদ্ধবিরতি ছিল। বাকি সময়ে উপত্যকাটিতে নির্বিচার হামলা চালিয়ে ৬৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। আহত প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার জনকে।

গাজার উপকুল ধরে উত্তর গাজায় ফিরছেন ফিলিস্তিনিরা
সেনা প্রত্যাহার নিয়ে অস্পষ্টতা
হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত একটি মানচিত্রে দেখা যায়, ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার অধীনে তিন ধাপে গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে। গত দুই বছরে উপত্যকার ৮০ শতাংশের বেশি এলাকা দখল করে নেয় ইসরাইলি বাহিনী। যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে সেনাদের অবস্থান সরিয়ে নিলে ৫৩ শতাংশ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আর দ্বিতীয় ধাপে নিয়ন্ত্রণে থাকবে ৪০ শতাংশ এলাকা।

শেষ ধাপে সেনাদের অবস্থান সরিয়ে নিলে গাজা-ইসরায়েল সীমান্ত বরাবর ১৫ শতাংশ এলাকা ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওই এলাকায় ‘নিরাপত্তা গলি’ তৈরি করা হবে। হুমকি পুরোপুরি কেটে না যাওয়া পর্যন্ত সেখানে ইসরাইলি সেনারা অবস্থান করবেন। তবে এই হুমকির কথা বলে সেনারা কত দিন থাকবেন, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
যুদ্ধবিরতির পর গতকাল গাজার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রথম ধাপে ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থান সরিয়ে নিতে দেখা যায়। উপত্যকার দক্ষিণে খান ইউনিস, মধ্যাঞ্চলে নুসেইরাত শরণার্থীশিবির এবং উত্তরে গাজা নগরীর ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল থেকে সেনা ও ট্যাংকগুলো পূর্ব দিকে সরিয়ে নেওয়া হয় ।
ফিলিস্তিনি বন্দীদের তালিকা প্রকাশ
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামলা চালিয়েছিল হামাস। এরপর সেদিন থেকেই গাজায় হামলা শুরু করে ইসরাইল। তখন ইসরাইল থেকে প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যায় হামাস। ধাপে ধাপে এই জিম্মিদের মুক্তি দেওয়ার পর এখনো উপত্যকাটিতে ৪৮ জন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা ইসরাইলের।
চুক্তি অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জীবিত ২০ জিম্মিকে মুক্তি দিতে হবে হামাসকে। তবে মৃত জিম্মিদের লাশ কবে নাগাদ হামাস ফেরত দিতে পারবে, তা পরিষ্কার নয়। ইসরাইলি গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা গেছে, জীবিত বা মৃত জিম্মিদের ফেরত নেওয়ার সময় আগের মতো এবার আর কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে না। গণমাধ্যমকেও এ থেকে দূরে রাখা হবে।
জিম্মিদের ফেরত দেওয়ার পর যে ১ হাজার ৯৫০ জন ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হবে, তাদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে ইসরাইল। তাদের মধ্যে ২৫০ জন যাবজ্জীবন কারাদÐ প্রাপ্ত। এই ২৫০ জনের মধ্যে ১৫৯ জন ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের ক্ষমতাসীন দল ফাতাহর, ৬৩ জন হামাসের, ১৬ জন ইসলামিক জিহাদের এবং ১২ জন পিএফএলপির সদস্য।
গাজায় দুই বছর ধরে ইসরায়েলি নৃশংসতার মুখে একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে গাজার ২৩ লাখ বাসিন্দার প্রায় সবাইকে। এর মধ্যে গত আগস্টে গাজা নগরীতে ইসরাইলের স্থল অভিযান শুরুর পর পালিয়েছিলেন ৭ লাখ ফিলিস্তিনি। এখন যুদ্ধবিরতি ও ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের খবরে অনেকে আবার গাজা নগরীসহ উত্তরের এলাকাগুলোয় ফেরা শুরু করেছেন।
গত দুই বছরে ইসরইলের নির্বিচার হামলায় গাজায় ৪ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি বা ৯২ শতাংশ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। স্কুল ধ্বংস হয়েছে ৫১৮টি। ফলে শিক্ষাবঞ্চিত হচ্ছে প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার শিক্ষার্থী। ৬৫৪টি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর ইসরাইলের হামলার কারণে গাজার মাত্র দেড় শতাংশ কৃষিজমি চাষাবাদের যোগ্য রয়েছে।

ইসরাইলি বর্বর হামলায় বিধ্বস্ত গাজার খান ইউনুসের দৃশ্য
এদিকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরায়েলের মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরও গতকাল গাজার আকাশে দেখা গেছে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার। দক্ষিণ গাজায় ট্যাংক ও কামানের গোলার শব্দ পাওয়া গেছে। মধ্য গাজায় গোলাগুলির শব্দের কারণে অনেক ফিলিস্তিনিই উত্তরের দিকে নিজেদের ঘরবাড়িতে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন।
দিনে ৬০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি
ইসরাইলের আগ্রাসনের শুরুর দিকে অনেক ফিলিস্তিনি গাজা ছেড়ে মিসরে চলে গিয়েছিলেন। তাদের দক্ষিণ গাজার রাফা ক্রসিং দিয়ে আবার প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ইসরাইলের সম্প্রচারমাধ্যম আর্মি রেডিও। তাদের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় গাজায় প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক করে ত্রাণ প্রবেশের অনুমতিও দেবে ইসরায়েল।
গতকাল পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জাতিসংঘের একজন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, গাজায় সরবরাহের জন্য ১ লাখ ৭০ হাজার টন ত্রাণ মিসর ও জর্ডানে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।।
যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণে থাকবে টাস্কফোর্স
গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণে একটি টাস্কফোর্সের আওতায় ইসরাইলে ২০০ সেনা পাঠানো হবে। এর দায়িত্বে থাকবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড। এই টাস্কফোর্সে যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, কাতার, তুরস্কসহ বিভিন্ন আরব ও মুসলিম দেশের সেনারা থাকবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছেন, এই টাস্কফোর্সের আওতায় কোনো মার্কিন সেনা গাজায় প্রবেশ করবে না। তারা ইসরাইলের সীমানার মধ্যে ধেতে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি তাঁরা গাজায় ত্রাণ প্রবেশের বিষয়েও সহায়তা করবেন। আর বন্দিবিনিময় শেষ হলে গাজায় নিরাপত্তার জন্য একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠন নিয়ে কাজ করা হবে। তবে এ বিষয়ে এগোনো হবে হামাস ও ইসরায়েলের ঐকমত্যের পর, যুদ্ধবিরতির পরের ধাপে।
গাজায় সংঘাত ঘিরে গত দুই বছরে অশান্ত হয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্য। এ সময়ে ইসরাইল গাজা ছাড়াও হামলা চালিয়েছে ইরান, লেবানন, ইয়েমেন ও সর্বশেষ কাতারে। এই সংঘাত ঘিরে মিত্র অনেক দেশ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ইসরাইল। ইসরায়েল যখন বৈশ্বিক অঙ্গনে ক্রমেই একঘরে হয়ে পড়ছে, তখন গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন ট্রাম্প।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *