কেবল মাদুরো নয় আরো অনেক রাষ্ট্রনেতাকে গ্রেপ্তার ও হত্যা করেছে যুক্তরাষ্ট্র

নিকোলাস মাদুরো। ছবি সংগৃহীত
নিউজ ডেস্ক
এনভিবিডি24ডটকম
০৩ জানুয়ারি, ২০২৬
কয়েক মাস ধরেই মাদুরোর ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুধু আনুষ্ঠানিকতাটুকু বাকি ছিল। অবশেষে গতকাল শনিবার ভোরে (স্থানীয় সময় শুক্রবার রাতে) মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত ইউনিট ‘ডেল্টা ফোর্স’ অভিযান চালায় ভেনেজুয়েলায়। আটক করে নিউইয়র্কে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে; সঙ্গে তার স্ত্রীকেও। সূত্র: গার্ডিয়ান, আল–জাজিরা
মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদে জড়িত অভিযোগে হুগো শ্যাভেজের এই উত্তরসূরিকে আটক করা হয় বলে দাবি যুক্তরাষ্ট্রের। যদিও রাশিয়া, ইরান, চীনসহ বিভিন্ন দেশ একটি স্বাধীন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের অভিযানের সমালোচনা করেছে।
কোনো দেশের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে এভাবে বন্দী করার ঘটনা নজিরবিহীন। মূলত ভেনেজুয়েলার ওপর কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করে চলা তীব্র চাপের ফল মাদুরোকে তুলে নেওয়ার এ ঘটনা। গত সেপ্টেম্বর মাস থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ভেনেজুয়েলা উপকূলের কাছাকাছি বিশাল নৌবহর মোতায়েন করে রেখেছে।
ইতিমধ্যে মাদক পাচারের অভিযোগে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে কয়েকটি নৌযানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজও জব্দ করেছে তারা। এসব হামলায় কমপক্ষে ১১০ জন নিহত হয়েছেন।
ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুত দখল করতেই যুক্তরাষ্ট্র এসব করছে। মাদুরোকে বন্দী করার এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের এক নাটকীয় রূপ। এ অভিযানের কারণে এখন ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের অভিযান এটাই প্রথম নয়; আগেও নিজের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র অনেক দেশে অভিযান চালিয়েছে। সেসব অভিযানে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের মতো বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে আটকের ঘটনা ঘটেছে।
জেনারেল নরিয়েগা

জেনারেল ম্যানুয়েল নরিয়েগা। ফাইল ছবি
পানামা খালের ওপর আন্তর্জাতিক ব্যবসা–বাণিজ্য এ খালের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। লাতিন আমেরিকার দেশ পানামার নামানুসারে খালটির নামকরণ করা হয়েছে।
১৯৮৯ সালে গভীর রাতে পানামায় হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে অপসারণের জন্য এ হামলা চালানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের সুরক্ষা, অগণতান্ত্রিক আচরণ, দুর্নীতি ও মাদক ব্যবসার কারণ দেখিয়ে এ হামলা চালান হয়।
পানামায় হামলা চালানোর আগে ১৯৮৮ সালেই নরিয়েগার বিরুদ্ধে ছক কষা হয়েছিল। মাদক চোরাচালানের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মায়ামিতে অভিযোগ দায়ের করা হয়। ঠিক মাদুরোকে যেভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে সেভাবে।
অথচ নরিয়েগার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দহরম–মহরম ছিল। তিনি ১৯৭০–এর দশকের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) গুপ্তচর হিসেবে কাজ করতেন। অর্থের বিনিময়ে সিআইএর কাছে তথ্য পাচার করাই ছিল তার কাজ।
পানামার তৎকালীন সামরিক শাসক ওমর তোরিজোসের প্রিয়পাত্র ছিলেন নরিয়েগা। তোরিজোস তাকে পানামার সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান করেন। সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেন নরিয়েগা।
১৯৮১ সালে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় তোরিজোস মারা যান। দুই বছর পর পানামার ক্ষমতা চলে যায় নরিয়েগার হাতে। এ সুযোগে কলম্বিয়ার কুখ্যাত মাদকসম্রাটদের সঙ্গে মাদক পাচারে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের চোখে ধুলো দিয়ে তো আর পৃথিবীর কোথাও কিছু করা যায় না। লুকোছাপা করে মাদক ব্যবসা চালিয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র ঠিকই নরিয়েগার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে পারে। কিন্তু শুরুতে নিজের স্বার্থে নরিয়েগার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তারা।
নরিয়েগার সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের টানাপোড়েনের শুরু ১৯৮৫ সালে। পানামার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলা আরদিতো বারলেত্তাকে পদত্যাগে বাধ্য করে দেশের ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন নরিয়েগা।
১৯৮৯ সালের সাধারণ নির্বাচনও বাতিল করেন নরিয়েগা। এতেই ক্ষ্যান্ত হননি; যুক্তরাষ্ট্র যাতে পানামার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করতে পারে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী আবেগকে সমর্থন করেন। বিষয়গুলো ভালোভাবে নেয়নি ওয়াশিংটন।
এভাবে একসময়ের মিত্র থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতে পরিণত হন এই জেনারেল। শেষমেষ তিনি নিজেই চালে ভুল করে বসেন, যার পরিণতিও তাকে ভোগ করতে হয়।
দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির সঙ্গে সঙ্গে পানামা খাল অঞ্চলে অবস্থান করা মার্কিন সেনাদের সঙ্গে নরিয়েগার পানামা ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
১৯৮৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর মার্কিন চার সেনা কর্মকর্তা রাতে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন। পথ ভুল করে তাদের গাড়ি পিডিএফের তল্লাশিচৌকির সামনে পড়ে গিয়েছিল। একপর্যায়ে পিডিএফের রক্ষীরা গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালান।
পিডিএফ রক্ষীদের গুলিতে মার্কিন তিন সেনা আহত হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সামরিক হাসপাতালে মারা যান একজন। এ ঘটনায় মার্কিন সেনাবাহিনীতে তোলপাড় শুরু হয়। খেপে যান তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ।
পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে হোয়াইট হাউসে উপদেষ্টাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন বুশ। প্রতিরক্ষা ও সামরিক কর্মকর্তারাও এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন। ওই বৈঠকেই ২০ ডিসেম্বর পানামায় হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কৌশলগত কারণে অভিযানের সময় এগিয়ে ১৯ ডিসেম্বর করা হয়। ওই দিন রাতে পানামার বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করে মার্কিন বাহিনী। পিডিএফের দুটি রাইফেল কোম্পানির ব্যারাকে দুই হাজার পাউন্ড ওজনের বোমা ফেলা হয়। রাতভর পানামা সিটিতে লড়াই চলে। মার্কিন বাহিনীর সামনে পিডিএফ তেমন কোনো প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেনি।
২০ ডিসেম্বর সকালে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে পানামায় অভিযান চালানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরেন বুশ। তিনি বলেন, এ হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল মার্কিনদের জীবন রক্ষা, পানামায় গণতন্ত্র রক্ষা, মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই ও পানামা খাল চুক্তির অখণ্ডতা রক্ষা করা।
সাদ্দাম হোসেন

সাদ্দাম হোসেন।ফাইল ছবি
২০০৩ সালের ২০ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো ইরাকে হামলা চালায়। দেশটির প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ আছে—এমন অভিযোগে এ হামলা চালানো হয়েছিল।
এ যুদ্ধের প্রতি অধিকাংশ ইরাকির প্রাথমিক সমর্থন ছিল—যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন এমন মিথ্যা দাবি করে। নরিয়েগার মতো সাদ্দামও একসময় ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ছিলেন।
১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধে অন্তত ১০ লাখ মানুষ নিহত হয়। এর কয়েক বছরের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাদ্দামের মিত্রতা তিক্ততায় পরিণত হয়। ২০০১ সালে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে ভয়াবহ হামলার পর বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ওই হামলার সঙ্গে আল-কায়েদার জড়িত থাকার প্রমাণ পায় যুক্তরাষ্ট্র।
সাদ্দাম হোসেন আল-কায়েদাকে সমর্থন করছেন বলে অভিযোগ তোলে যুক্তরাষ্ট্র; যদিও এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি তারা। তার বিরুদ্ধে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার প্রমাণও দেখাতে পারেনি দেশটি।
অভিযোগের জেরে ৯ মাস ধরে ইরাকজুড়ে অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। অভিযানের একপর্যায়ে সরকারের পতন ঘটলে সাদ্দাম আত্মগোপনে যান। পরে ২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর সাদ্দাম হোসেনকে গ্রেপ্তার করে মার্কিন সেনাবাহিনী। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ফাঁসি দেওয়া হয় তাকে।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ও তাঁর সামরিক জেনারেলরা ইরাকিদের একটি সমৃদ্ধ গণতন্ত্র ও অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তা পূরণ তো হয়নি; উল্টো আরও সহিংসতা ইরাককে গ্রাস করে।
ইরাক বডি কাউন্ট প্রজেক্ট নামের একটি সংস্থার হিসাবমতে, ওই আগ্রাসন ও তৎপরবর্তী মার্কিন দখলদারত্বে ইরাকে ২ লাখ ১০ হাজার বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।
হুয়ান অরল্যান্ডো এরনান্দেজ

হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো এররনান্দেজ। ফাইলছবি
মধ্য আমেরিকার দেশ হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো এরনান্দেজকে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে হন্ডুরাসের রাজধানী তেগুসিগালপায় নিজ বাড়ি থেকে অরল্যান্ডো এরনান্দেজকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাকে হাতকড়া পরিয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এর কয়েক দিন আগে পদত্যাগ করেছিলেন তিনি।
২০১৪ থেকে ২০২২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন অরল্যান্ডো এরনান্দেজ। মাদক চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের সঙ্গে তার জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। তিনি অবশ্য তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
গ্রেপ্তার করার পর ২০২২ সালের এপ্রিলে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ফারনান্দেজকে যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তর করা হয়। ওই বছরের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত তাকে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়।
মাদক ও অস্ত্র মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় এ দণ্ড দেওয়া হয় এরনান্দেজকে। একসময় হন্ডুরাসের সাবেক এই রাষ্ট্রপ্রধানকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত মিত্র বিবেচনা করা হতো।
এরনান্দেজের বিরুদ্ধে অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে কোকেন পাচারকারীদের রক্ষার জন্য লাখ লাখ ডলার ঘুষ নিয়েছিলেন তিনি। পাচারকারীদের রক্ষা করতেও লড়াইয়ের প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছিলেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এরনান্দেজকে ক্ষমা করে দেওয়ায় গত বছরের ১ ডিসেম্বর কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
