রাজনীতিসর্বশেষ

রাজনীতি

বিএনপি-জামায়াত বিপরিত অবস্থানে, গণভোট প্রশ্নে অগ্রগতি নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক
এনভিবিডি২৪ডটকম
০৯ নভেম্বর, ২০২৫
দেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু হল গণভোট । কিন্তু কখন এই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে এ নিয়েই প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বিপরীত অবস্থানে রয়েছে। বিএনপি ও এর মিত্ররা বলছে, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একদিনেই হতে হবে। তাদের দাবি, নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের প্রচেষ্টা ফেব্রæয়ারির ভোট বানচালের ষড়যন্ত্র। বিপরীতে জামায়াত ও সমমনা আট দল নভেম্বরের মধ্যেই গণভোট চায় এবং সে দাবি আদায়ে রাজপথে কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে তারা।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাতে এক সপ্তাহ সময় দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াত-বিএনপিসহ বিভিন্ন দলকে আলোচনায় বসার আহŸান জানালেও বিএনপি তাতে সাড়া দেয়নি। দলটির বক্তব্য, আলোচনার আহŸান যদি সরকার জানায়, তবেই তারা বসবে। আগামীকাল সোমবার সরকারের বেঁধে দেওয়া এ সময়ও শেষ হচ্ছে। এরপরও অগ্রগতি না হলে সরকার শিগগির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে পারে।
অন্যদিকে জামায়াত ও সমমনা আট দল মঙ্গলবারের মধ্যে গণভোটের তারিখ ঘোষণা না এলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছে। সব মিলিয়ে গণভোটসহ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন স¤প্রতি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। সুপারিশে কমিশন জাতীয় নির্বাচনের আগে অথবা একই দিনে গণভোট করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে তারা সরকারকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা বলেছে। গণভোট ছাড়াও জুলাই জাতীয় সনদের উচ্চকক্ষে পিআর, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ২৭০ দিনের সময়সীমা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
সূত্রমতে, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি বিষয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সে অনুযায়ী বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সরকার কর্তৃক গঠিত হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। দীর্ঘ আলোচনায় বেশ কিছু বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রস্তাবেই বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়। মতানৈক্যের বিষয়গুলো গণভোটে দেওয়ার জন্য শুরু থেকেই দাবি জানায় জামায়াতসহ সমমনা দলগুলো। এক পর্যায়ে গত ২৮ অক্টোবর ঐকমত্য কমিশন জুলাই জাতীয় সনদে গণভোটের সুযোগ রেখে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করে।
৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে ঐকমত্য কমিশন দুটি বিকল্প সুপারিশ করে। একটিতে বলা হয়েছে, ২৭০ দিনের মধ্যে আগামী সংসদ সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে। সে ক্ষেত্রে সংস্কার প্রস্তাবগুলো বিল আকারে আদেশের তফসিলে থাকবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও খসড়া বিলের ওপর গণভোট হবে। দ্বিতীয় সুপারিশ অনুযায়ী, আদেশ ও আদেশের তফসিলে থাকা সংস্কার প্রস্তাবের ওপর গণভোট হবে। তবে দুটি বিকল্প উপায়ের কোনোটিতেই সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গণভোটে রাজনৈতিক দলের ভিন্নমত গুরুত্ব পাবে না। গণভোটে ‘হ্যাঁ’জয়ী হলে ঐকমত্য কমিশনের সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হবে।
এদিকে গত ৩০ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আদেশ জারি ও জাতীয় নির্বাচনের আগে তথা নভেম্বরেই গণভোটের দাবি জানায় জামায়াতে ইসলামী। পরে এই ইস্যুসহ পাঁচ দফা দাবিতে জামায়াতসহ সমমনা আট দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। একই দিন বিএনপির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট ‘অযৌক্তিক’, ‘অবিবেচনাপ্রসূত’ বলে মন্তব্য করা হয়। বলা হয়, নির্বাচনের দিন ছাড়া গণভোটের সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেনে নেবে না বিএনপি। তাদের মতে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ একপেশে এবং তা জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে জুলাই সনদ ইস্যুতে অনেকটা কৌশলী অবস্থানে আছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটি এখনো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি। ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ জমার পরদিন সংবাদ সম্মেলনে দলটির মুখ্য সমম্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ দেখার পরই এতে স্বাক্ষরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে দলটি। গণভোটের বিষয়ে জাতীয় নির্বাচনের আগে বা একই দিনে হওয়া নিয়ে তাদের তেমন কোনো দাবি বা আপত্তি নেই বলেও জানা গেছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার মধ্যে গত ২ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলনে বিএনপিকে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেয় জামায়াত। পরদিন অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে বসে সমস্যা সমাধানের জন্য এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়। এ উদ্যোগে সাড়া দিয়ে ৪ নভেম্বর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার জন্য নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহেরের নেতৃত্বে দুই সদস্যের কমিটি করে জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ। ৬ নভেম্বর রাজধানীতে সমাবেশ করে প্রধান উপদেষ্টাকে স্মারকলিপি দেয় জামায়াতসহ আট দল। এ সময় আলোচনার বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে রেফারির ভ‚মিকা পালনের আহŸান জানানো হয়। একই দিন আলোচনার প্রস্তাব করে বিএনপি মহাসচিবকে ফোন করেন জামায়াত নেতা ডা. তাহের।
তবে বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের দিনক্ষণ নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট নিরসনে জামায়াতের আলোচনায় বসার আহŸান সঠিক পন্থা নয়। তবে সরকার এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলে তাতে সাড়া দেবে দলটি। তাছাড়া সরকারের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয় আপাতত এমন কিছু করবে না বিএনপি। পরে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে সিদ্ধান্তটি জানানো হয়।
এ বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিএনপি আমাদের আলোচনার প্রস্তাবে রাজি হয়নি। অথচ বিএনপি যদি আমাদের ডাকে তাহলে আমরা বসতে রাজি। দলীয় ইগো থাকলে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাবেক এমপি হামিদুর রহমান আযাদ আরো বলেন, অন্যান্য দলের সঙ্গেও আমাদের যোগাযোগ হচ্ছে। বিএনপি বসলে তারাও সাড়া দিত। তিনি বলেন, আমরা সমাধান চাই। আমরা ৮ দলের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার শান্তিপূর্ণ জনসভা করব। এর মধ্যে আমাদের দাবি না মানলে সেখান থেকে পরবর্তী কর্মসূচি দেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে শনিবার রাজধানীতে এক সংলাপ অনুষ্ঠানে জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিগত রেজিম কিন্তু এ ধরনের সুর সব সময় বাজাত যে অমুকের সঙ্গে বসবে না। এ কালচার থেকে কি বের হতে পারি না? বিএনপি যদি আহŸান করে জামায়াত যাবে এবং অন্যদেরও আহŸান জানাবে। পাঁচ দফা দাবিতে রাজপথে নামার বিষয়ে তিনি বলেন, জামায়াত আগে থেকেই মাঠে আছে, হঠাৎ করে আসেনি। আলোচনা ও রাজপথে নিজেদের দাবি জানানো সমানভাবে চলছে।
একই অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ সাংঘর্ষিক রাজনীতি দেখতে চায় না, স্থিতিশীলতা দেখতে চায়। জামায়াত সংশ্লিষ্টদের আন্দোলনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, কথায় কথায় আপনি রাস্তায় যাবেন। এখন অন্য দল যদি তার প্রতিবাদে আবার রাস্তায় যায়, তাহলে কী হবে, সংঘর্ষ হবে না? এজন্য কি আমরা শেখ হাসিনাকে বিদায় করেছি?
তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশ্বাস করতে হবে যে যতটুকু ঐকমত্য হয়েছে, তার বাইরে গিয়ে আবার নতুন ইস্যু সৃষ্টি করলে কিন্তু ঐকমত্যের শ্রদ্ধা দেখানো হচ্ছে না। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ঐকমত্য হতে হবে। যেগুলোয় ঐকমত্য হয়নি, তা জনগণের কাছে নিয়ে যেতে হবে বলে মত দেন তিনি। ঐকমত্যের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে জানান এই নেতা।
গণভোট প্রসঙ্গে বিএনপির এ নেতা বলেন, গণভোট করতে হলে বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান অনুসারে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সংসদে এসে সংসদে পাস করার পরে সেই বিষয়গুলো গণভোটে যেতে পারে। এসব করে অনেকে নির্বাচনকে বিলম্বিত করতে চায় বলে মন্তব্য করেন আমীর খসরু।
জুলাই সনদ ও গণভোট প্রসঙ্গে এনসিপির যুগ্ম আহŸায়ক ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি জারি করা ছাড়া আমরা এতে স্বাক্ষর করব না। তবে আলোচনা সাপেক্ষে সুবিধাজনক সময়ে গণভোট হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আট দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক
এদিকে পাঁচ দফা দাবিতে ১১ নভেম্বর ঢাকায় সমাবেশ করবে জামায়াতসহ আন্দোলনরত আটদল। এ সময়ের মধ্যে জনগণের দাবিগুলো না মানা হলে জনসভা থেকে কঠোরতম কর্মসূচি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নেতারা।
গতকাল শনিবার দুপুরে জাগপা ঢাকা মহানগর কার্যালয়ে আন্দোলনরত ৮ দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে তারা বলেন, আমরা আলোচনায় বসার জন্য বিএনপিসহ সবাইকে আহŸান জানিয়েছি কিন্তু বিএনপি আমাদের আহŸানে আলোচনায় বসতে রাজি নয়। তাহলে বিএনপি আহŸান জানাক, দেশ জাতি জনগণের স্বার্থে আমরা আলোচনায় অংশ নেব। কিন্তু কালক্ষেপণ করে গণভোটকে জাতীয় নির্বাচনের দিন নেওয়ার চেষ্টা করে কোনো লাভ হবে না। গণভোট জাতীয় নির্বাচনের আগেই হতে হবে। জনগণের দাবি মেনে নেওয়া না হলে ১১ তারিখ আমাদের জনসভা থেকে কঠোরতম কর্মসূচি ঘোষণা করে হবে।
জাগপা সহ-সভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধানের সভাপতিত্বে আট দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে বক্তব্য রাখেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন্দ, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন, খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির সাখাওয়াত হোসাইন ও যুগ্ম মহাসচিব মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার চৌধুরী, খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ইউসুফ সাদেক হাক্কানি, ডেভেলপমেন্ট পার্টির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবু নাসের নূর নবী জনি প্রমুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *