আন্তর্জাতিকসর্বশেষ

লেবাননে ভয়াবহ ইসরাইলি হামলায় নিহত ১৮, হরমুজ ফের বন্ধ করল ইরান

নিউজ ডেস্ক

এনভিবিডি24ডটকম

1৯ জুন, ২০২৬

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলের শতাধিক বিমান হামলায় বহু হতাহতের ঘটনায় সম্প্রতি স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তিটি এখন গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই এই সহিংসতার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা

চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের মধ্যে একটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

তবে বৈঠকটি শুরুর আগেই লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। এই ঘটনার পরপরই মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তার নির্ধারিত সুইজারল্যান্ড সফর শেষ মুহূর্তে বাতিল করেন। অন্যদিকে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী লেবাননে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের স্পষ্ট লক্ষণ না দেখা যাওয়া পর্যন্ত তাদের প্রতিনিধি দল আলোচনায় অংশ নেবে না। সার্বিক পরিস্থিতিতে সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৈঠকটি আপাতত স্থগিত ঘোষণা করেছে। ইরান এই হামলার পর হরমুজ প্রণালী পুণরায় বন্ধ ঘোষণা করেছে।

ইসরাইলের এই অব্যাহত বোমা হামলাকে বিশ্লেষকরা শান্তি প্রক্রিয়া নস্যাৎ করার একটি বড় চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। গত মার্চ মাস থেকে লেবাননে প্রায় প্রতিদিন হামলা চালিয়ে আসছে ইসরাইল, যার ফলে এ পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বর্তমানে লেবাননের এক-পঞ্চমাংশ অঞ্চল ইসরাইলি বাহিনীর দখলে রয়েছে। মার্কিন-ইরান চুক্তিতে লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, ইসরাইলের কট্টরপন্থী নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তারা লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবেন না। এমনকি ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির উগ্র মন্তব্য করে বলেছেন, পুরো লেবাননকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া উচিত।

ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর দাবি, লেবাননে তাদের এই সাম্প্রতিক অভিযানটি মূলত ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাব। হিজবুল্লাহও লেবাননের অভ্যন্তরে ইসরাইলি ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালানোর কথা স্বীকার করেছে, যেখানে চার ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছে। এই সহিংসতার সূত্রপাত মূলত গত মার্চ মাসে, যখন মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডের জবাবে হিজবুল্লাহ ইসরাইলে রকেট হামলা শুরু করে।

মার্কিন-ইরান সমঝোতা স্মারকের প্রথম দফায় স্পষ্ট বলা হয়েছে যে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে। তবে এই চুক্তিতে ইসরাইলের কোনো সরাসরি উল্লেখ না থাকায় এবং ইসরাইল বা হিজবুল্লাহ এর স্বাক্ষরকারী না হওয়ায়, এটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অবশ্য বলেছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে আলাদা করে দেখে না এবং ইসরাইল যাতে এই চুক্তি মেনে চলে তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সম্পূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের।

এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও ইসরাইলের মধ্যকার সম্পর্কেও তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। চুক্তিটি স্বাক্ষরের আগে ইসরাইলকে এই বিষয়ে কোনো আভাস দেওয়া হয়নি, যা দেশটির রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বেসামরিক অঞ্চলে নির্বিচার বোমা হামলার কৌশলের তীব্র সমালোচনা করেছেন। এছাড়া মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসরাইলি মন্ত্রীদের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, কেবল হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে সব জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই শান্তি চুক্তি টিকিয়ে রাখা এখন সম্পূর্ণভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্টের পরিচালক আলী ভায়েজ মনে করেন, ট্রাম্প যদি সত্যিই এই চুক্তি সফল করতে চান, তবে তাকে মার্কিন প্রভাব খাটিয়ে নেতানিয়াহুকে লেবাননে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করতে হবে। অন্যথায় ইরানের কাছে এই চুক্তির কোনো মূল্য থাকবে না। অন্যদিকে ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গবেষক তাহানি মুস্তাফা মনে করেন, আসন্ন অক্টোবরের নির্বাচনকে সামনে রেখে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের কারণে নেতানিয়াহু এই শান্তি প্রক্রিয়া পুরোপুরি ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ইসরাইলের ওপর কতটা কঠোর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তার ওপরেই নির্ভর করছে এই শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *