আন্তর্জাতিকসর্বশেষ

ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ভয়াবহ নির্যাতন

নিউজ ডেস্ক
এনভি টোয়েন্টিফোর ডটকম
২০ অক্টোবর, ২০২৫

ইসরাইলের কারাগারে আট মাস বন্দী থাকা মাহমুদ আবু ফউল মুক্তি পাওয়ার পর মায়ের গলা শুনতে পেয়েছেন। কিন্তু এই ফিলিস্তিনি তরুণ মায়ের মুখ দেখতে পাচ্ছেন না।
মাহমুদের বয়স ২৮ বছর। তার বাড়ি গাজার উত্তরাঞ্চলে। গত বছর ডিসেম্বরের শেষ দিকে কামাল আদওয়ান হাসপাতাল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেছিল ইসরাইলি বাহিনী। এর পর থেকে তিনি ইসরাইলের বন্দিশালায় ছিলেন। কারারক্ষীরা তাকে এতটাই নির্যাতন ও নিষ্ঠুরভাবে মারধর করেছেন যে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন।

মুক্তির পর নির্যাতনে দৃষ্টিশক্তি হারানো মাহমুদ তার মাকে জড়িয়ে ধরেছেন। তিনি কথা শুনে মাকে চিনতে পারলেন কিন্ত তাকে দেখতে পারছেন না। ছবি: আল-জাজিরা
গাজায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীন এ সপ্তাহে প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দী ইসরাইলের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তাদের অনেকের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন দেখা গেছে।
মাহমুদ ২০১৫ সালে ইসরাইলের বোমা হামলায় পা হারান। তিনি বলেন, বন্দী থাকার সময় তাকে অবিরাম নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। রাখা হয় ইসরাইলের কুখ্যাত সদে তেইমান কারাগারে। আরও অনেক বন্দী এ কারাগারে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
মাহমুদ বলেছেন, তাকে ওই কারাগারে প্রচÐ নির্যাতন ও মারধর করা হতো। এমন একদিনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে মাহমুদ বলেন, কারারক্ষীরা সেদিন তার মাথায় এত জোরে আঘাত করেন যে তিনি অচেতন হয়ে পড়েছিলেন।
মাহমুদ আরও বলেন, ‘আমি বারবার আমাকে চিকিৎসা করাতে বলছিলাম। কিন্তু তাঁরা শুধু আমার চোখে একধরনের ড্রপ দিয়েছেন, যেটি কোনো কাজই করেনি। আমার চোখ দিয়ে ক্রমাগত পানি পড়ছিল, ময়লা বের হচ্ছিল ও ব্যথা করছিল। কিন্তু তারা গুরুত্ব দেননি।’
চিকিৎসা পেতে মাহমুদ অনশনের চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ তার দাবি আমলেই নেয়নি।
অবশেষে বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর মাহমুদকে নাসের হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি পরিবারের দেখা পেতে উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সেখানে তাঁর মা আসেন।
মাহমুদ বলেন, ‘তাঁর (মায়ের) গলা শুনেই আমি তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরি। আমি তাকে দেখতে পাচ্ছিলাম না, তবে শুধু গলার আওয়াজ শুনতে পাওয়াটাও আমার কাছে পুরো পৃথিবী পাওয়ার সমান।’
মাহমুদ এখন গাজায় বাড়ির ধ্বংসাবশেষের কাছে একটি তাঁবুতে বসবাস করছেন। এখনো তার চোখের চিকিৎসা হয়নি। চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যেতে তিনি সাহায্য কামনা করেছেন।
ইসরাইলি কারাগারে বন্দীদের পদ্ধতিগতভাবে নির্যাতন-নিপীড়নের প্রমাণ ক্রমে বাড়ছে। মাহমুদ যেসব নির্যাতনের শিকার হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন, সেগুলো ওই সব প্রমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইসরাইলের কারাগার থেকে এ সপ্তাহে মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনিদের অনেককে দুর্বল ও অসুস্থ মনে হয়েছে বা তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। একজনের ওজন তাঁর বন্দী হওয়ার আগের ওজনের অর্ধেক হয়ে গেছে।
প্যালেস্টিনিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বন্দী থাকা ১০০ সাবেক ফিলিস্তিনি বন্দীর সাক্ষ্য নথিবদ্ধ করেছে। তারা দেখেছে, শুধু সদে তেইমানের মতো কুখ্যাত বন্দিশালাতেই নয়; বরং ইসরাইলের সব কারাগারে পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হয়।

ফিলিস্তিনি বন্দীদের বিচারক, আইনজীবী অথবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয় না। তাদের সব অধিকার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়।
ইসরাইল অন্তত ১০০ ফিলিস্তিনির লাশ ফিরিয়ে দিয়েছে, যারা বন্দী থাকার সময় মারা গেছেন।
গাজার হাসপাতাল সূত্র আল–জাজিরাকে বলেছে, কয়েকটি লাশে নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া গেছে এবং এমন কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা দেখে মনে হচ্ছে খুব সম্ভবত তাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: আল-জাজির

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *