আন্তর্জাতিকসর্বশেষ

ইরানের প্রতি ট্রাম্পের হুমকি-ধমকি কি কাজে আসছে

নিউজ ডেস্ক

এনভিবিডি24ডটকম

১৮ মে, ২০২৬

ক্ষমতায় ফিরে আসার পর প্রথম বছরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক আলোচনার কৌশল তাকে শুল্ক থেকে শুরু করে সশস্ত্র সংঘাত—বিভিন্ন ইস্যুতে নানা দেশ থেকে ছাড় আদায়ে সহায়তা করেছে।

কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে প্রকাশ্য হুমকি, অপমানসূচক মন্তব্য ও চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া নির্ভর চাপ প্রয়োগের কূটনীতি যেন অচলাবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে। এমনকি এটি যুদ্ধ অবসানের জন্য তার নিজের উদ্যোগগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে হচ্ছে। এই সংঘাত ইতিমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

দুই পক্ষের অচলাবস্থার মধ্যে ১১ সপ্তাহ ধরে চলা এই সংকট নিয়ে ট্রাম্প ক্রমেই হতাশার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তবে ইরানের নেতৃত্বের প্রতি তার কঠোর কূটনৈতিক অবস্থান নমনীয় করার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।

এটি দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য ভালো ইঙ্গিত নয়; বরং বর্তমান অচলাবস্থা ও বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে এর অভূতপূর্ব ধাক্কা দীর্ঘায়িত হতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে সময় সময় নতুন করে উত্তেজনাও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, ট্রাম্প যদি সত্যিই এই সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান চান, তাহলে প্রকাশ্য বক্তব্য ও তাৎক্ষণিক সাক্ষাৎকারে তীব্র ভাষার ব্যবহার কমানো উচিত।

বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার প্রধান বাধাগুলোর একটি হলো ইরানি শাসকদের মানসিকতা। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইলের হামলায় দেশটির অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন। সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও নিজেদের জনগণের কাছে মর্যাদা রক্ষা করার প্রয়োজন রয়েছে ইরানের শাসকদের।

যদিও গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর ইরান এখনো কৌশলগত প্রভাব বজায় রেখেছে, যা দেশটিকে উল্লেখযোগ্য দর–কষাকষির ক্ষমতা দিচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্প সর্বোচ্চ দাবি, অনিশ্চয়তা, মিশ্র বার্তা ও তীব্র ভাষানির্ভর কূটনৈতিক কৌশল অব্যাহত রেখেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ট্রাম্প এই সংঘাত থেকে এমনভাবে বের হতে চাইছেন, যেন এটি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ বিজয়। যদিও বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি তা সমর্থন করে না। অন্যদিকে ইরানও সম্পূর্ণ পরাজয় মেনে নিতে রাজি হবে না।

ইরান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক আলোচক রব ম্যালি বলেন, ‘এটি অবশ্যম্ভাবীভাবে একটি যৌক্তিক সমঝোতায় পৌঁছানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, শুধু ইরান নয়, কোনো সরকারই আত্মসমর্পণ করেছে—এমন ভাবমূর্তি বহন করার সামর্থ্য রাখে না।’

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও জো বাইডেন প্রশাসনে কাজ করেছেন রব ম্যালি। তিনি আরও বলেন, বর্তমান অচলাবস্থা এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্য ও অজনপ্রিয় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কারণে ট্রাম্প অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে রয়েছেন। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তাঁর জনপ্রিয়তাও কমেছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতেও হিমশিম খাচ্ছে তাঁর রিপাবলিকান পার্টি।

অনেকের মধ্যে এমন ভুল ধারণা আছে যে ইরানের ওপর যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করা গেলে তারা আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে বিষয়গুলো এভাবে কাজ করে না। এমন মন্তব্য করেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা নেট সোয়ানসন,

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস ট্রাম্পের কূটনৈতিক পদ্ধতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, এই কৌশল ‘ভালো চুক্তি অর্জনের প্রমাণিত রেকর্ডের’ ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তাঁর দাবি, সমঝোতায় পৌঁছাতে ইরান ক্রমেই ‘মরিয়া’ হয়ে উঠছে।

অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একজন দক্ষ আলোচক, যিনি সব সময় সঠিক সুর নির্ধারণ করতে জানেন।

ধ্বংসাত্মক হুমকি

গত মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প সবচেয়ে ভয়াবহ মন্তব্যটি করেন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, কোনো চুক্তিতে না পৌঁছালে ইরানের সভ্যতাই ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

পরে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, ট্রাম্পের এই বার্তা তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া হয়েছিল। এটি জাতীয় নিরাপত্তাকৌশলের অংশ হিসেবে যাচাই–বাছাই করা হয়নি।

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন। কিন্তু ইস্টার সানডেতে তিনি আবার অশালীন ভাষায় ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দেন। এর পর থেকে তিনি বারবার সেই হুঁশিয়ারির পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছেন। গত শুক্রবার চীন সফর শেষে এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালেও তিনি একই ধরনের মন্তব্য করেন।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, যদি তারা ‘ইরান থেকে বিশাল এক আলোর ঝলক বের হতে’ দেখেন, তাহলে বুঝতে হবে, বর্তমান যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছে।

কেউ কেউ এটিকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যদিও ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, তিনি কখনো এমন কিছু করবেন না।

ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, ইরান পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে। যদিও বাস্তবতা ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ‘সমঝোতার জন্য অনুনয় করছে’; যদিও তেহরান তা অস্বীকার করেছে। ট্রাম্প কখনো ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’-এর দাবি তুলেছেন। আবার কখনো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে ইরান নিজেদের টিকে থাকাকেই সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। দেশটির দাবি, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান প্রসঙ্গে বক্তব্যে আরও সংযম দেখাতে ট্রাম্পকে বোঝানোর কোনো উদ্যোগ হোয়াইট হাউসের ভেতরে নেওয়া হয়নি।

জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের ‘মাগা’ সমর্থকেরা মূলত তাঁর পাশে আছেন। তবে অতীতে তাকে সমর্থন করা কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। তার তীব্র হুমকিগুলোর সমালোচনা করেছেন।

মধ্যরাতের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট

সংকটপূর্ণ মুহূর্তগুলোয় ট্রাম্পের কিছু কঠোর বক্তব্য এসেছে তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে। প্রায়ই সেগুলো এসেছে মধ্যরাতের পর।

যেমন গত মাসে ট্রাম্প হঠাৎ করে ইরানের বন্দরগুলো অবরোধের ঘোষণা দেন। এরপর ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়। নাজুক যুদ্ধবিরতি আরও চাপের মুখে পড়ে। গত সোমবার ট্রাম্প ইরানি কর্মকর্তাদের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবকে ‘আবর্জনা’ বলে উড়িয়ে দেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—উভয় প্রশাসনের হয়ে কাজ করা মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ডেনিস রস বলেন, প্রেসিডেন্টের কৌশলগত ধৈর্যের অভাব এবং বক্তব্যের অসংগতি—তিনি যে বার্তা দিতে চান, সেটাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।

বেইজিং সফরের সময় ট্রাম্প ইরান নিয়ে তুলনামূলকভাবে সংযত ছিলেন। কারণ, তখন তিনি চীনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *