পিআর বিতর্ক, এর সুবিধা ও অসুবিধাবিশে^র কোন কোন দেশে আছে এ পদ্ধতি
নিজস্ব প্রতিবেদক
এনভি টোয়েন্টিফোর ডটকম
৩ অক্টোবর ২০২৫, এএম
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বর্তমানে ‘পিআর’ পদ্ধতিতে নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে। বড় দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী পিআর বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিসের মতো ইসলামপন্থি দলগুলো পিআর ইস্যুতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সভা-সমাবেশ চালিয়ে চাচ্ছে। বিএনপি ও তাদের যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী দলগুলোর পিআর পদ্ধতির বিপক্ষে। অপরদিকে জামায়াতের নায়েবে আমীর ডাক্তার সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মাদ তাহের বলেছেন, দেশের বর্তমান ৩১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৬টি পিআর এর পক্ষে।
দেশের ক্ষুদ্র দলগুলো মনে করছে, পিআর ব্যবস্থা চালু হলে তাদের জন্য সংসদে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে। তবে বিএনপির তার সমর্থক ছোট ছোট দলগুলোর আশঙ্কা, এতে স্থিতিশীল সরকার গঠনের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
পিআর পদ্ধতি কী?
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতি গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থার একটি বহুল আলোচিত মডেল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ পদ্ধতি চালু রয়েছে।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থায় ভোট ও আসনের মধ্যে সরাসরি অনুপাত তৈরি করা হয়। একটি দল যে শতাংশ ভোট পায়, সংসদে তাদের আসনসংখ্যাও সেই অনুপাতে নির্ধারিত হয়। যেমন একটি সংসদে যদি মোট ৩০০ আসন থাকে এবং কোনো দল ৩০ শতাংশ ভোট পায়, তবে তারা সংসদে প্রায় ৯০টি আসন পাবে। এতে কোনো ভোট ‘অপচয়’ হয় না, অর্থাৎ প্রতিটি ভোটের মূল্যায়ন রা হয় এবং তা সংসদে প্রভাব ফেলে।
পৃথিবীর যেসব দেশে পিআর ব্যবস্থা চালু আছে
পৃথিবীর বহু দেশেই পিআর ব্যবস্থার বিভিন্ন রূপ কার্যকর রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইউরোপ: জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে, স্পেন, গ্রিস, তুরস্ক, ইতালি। এশিয়া: ইসরাইল, নেপাল, শ্রীলংকা। আফ্রিকা: দক্ষিণ আফ্রিকা, নামিবিয়া, অ্যাঙ্গোলা। লাটিন আমেরিকা: ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলি, উরুগুয়ে। ওশেনিয়া: নিউজিল্যান্ড।
তবে বিভিন্ন দেশে এর প্রয়োগও ভিন্ন। যেমন জার্মানিতে মিশ্র পদ্ধতি রয়েছে, যেখানে ভোটাররা একদিকে সরাসরি প্রার্থীকে ভোট দেন, আবার দলকেও ভোট দেন। সংসদে আসন বণ্টন হয় এ দুটি হিসাব মিলিয়ে। অন্যদিকে ইসরাইল পুরোপুরি পিআরভিত্তিক নির্বাচন পরিচালনা করে, যেখানে কোনো সংসদ সদস্য সরাসরি নির্বাচিত হন না বরং দলীয় তালিকা থেকে আসন পূরণ করা হয়।
পিআর পদ্ধতির সুবিধা
১. প্রতিনিধিত্বের বিস্তার: ছোট দল ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠী সংসদে প্রবেশের সুযোগ পায়।
২. ভোটের সঠিক প্রতিফলন: জনগণের দেওয়া ভোটের শতকরা হার আসনে প্রতিফলিত হয়, ফলে ভোটের অপচয় হয় না।
৩. বহুমতের সহাবস্থান: সংসদে নানা মতাদর্শের সহাবস্থান ঘটে, যা গণতন্ত্রকে বহুমাত্রিক করে।
৪. ভোটার অংশগ্রহণ বেশি: প্রতিটি ভোটের মূল্য আছে বলে মানুষ ভোট দেওয়ার প্রতি উৎসাহিত হয়।
৫. ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরশাসন চালুর হুমকি থাকে না।
৬. স্থানীয় প্রার্থী না থাকায় মাস্তানতন্ত্রের হুমকি হ্রাস পায় এবং অর্থের মাধ্যমে ভোট কেনার সুযোগ থাকে না। ভোট সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
পিআর পদ্ধতির অসুবিধা
১. ভঙ্গুর সরকার: সাধারণত কোনো একক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না, ফলে বারবার জোট সরকার গঠন করতে হয়। এছাড়া দলগুলোর মধ্যে মতের মিল না হলে সবসময় সরকার ভেঙে যাওয়ার একটি আশঙ্কা থাকে।
২. ছোট দলের অতিরিক্ত প্রভাব: সংসদে কম সংখ্যক আসন থাকা দলগুলোও সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা অনেক সময় জটিলতা তৈরি করে।
৩. সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি: নানা মতাদর্শের কারণে সংসদে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। যার ফলে কোন আইন প্রণয়ন করতেও দীর্ঘ সময় লেগে যায় বা অনেক সময় তা সম্ভব-ই হয় না।
৪. জনগণের সঙ্গে এমপিদের দুর্বল সম্পর্ক: সরাসরি ভোটে নির্বাচিত এমপির মতো জনগণের সঙ্গে এমপিদের সম্পর্ক সবসময় দৃঢ় থাকে না। এলাকার চেয়ে দলের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা বেশি দেখা যায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পিআর বিতর্ক
বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যমান ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট বা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পদ্ধতিতে সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থীই বিজয়ী হন। তবে রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে যে এই ব্যবস্থায় প্রকৃত ভোটের প্রতিফলন ঘটে না। যেমন কোনো প্রার্থী ৩৫ শতাংশ ভোট পেলেও বিজয়ী হতে পারেন, আর বাকি ৬৫ শতাংশ ভোট (অন্যান্য প্রার্থীরা মিলে পেলে) কার্যত ‘অকার্যকর’ হয়ে যায়।
পিআর পদ্ধতির বিপক্ষে অনড় অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। এজন্য জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল দাবি তুলেছে, বাংলাদেশে আংশিক বা পূর্ণ পিআর ব্যবস্থা চালু করা হোক। তাদের যুক্তি, এতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সঠিক প্রতিফলন ঘটবে এবং ভোটাররা তাদের ভোটের পূর্ণ মূল্য পাবেন। তবে বড় দল বিএনপি মনে করছে, এতে (পিআর) স্থিতিশীল সরকার গঠন ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বাংলাদেশে পিআর পদ্ধতির চ্যালেঞ্জ
বিশ্বের যেসব দেশে পিআর ব্যবস্থা চালু সেসব দেশে গণতন্ত্রের বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি বেড়েছে। তবে এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ঘনঘন জোট পরিবর্তনের উদাহরণও কম নয়। উদাহরণস্বরূপ, ইসরাইল ও নেপালে প্রায়ই সরকার পরিবর্তন হয়, কারণ কোনো দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে না। অন্যদিকে, জার্মানি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, কারণ সেখানে মিশ্র পদ্ধতির মাধ্যমে ভারসাম্য আনা হয়েছে।
বাংলাদেশে যদি পিআর পদ্ধতি চালু হয়, তবে কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে পুরোপুরি নাকি আংশিক মিশ্র ব্যবস্থায়ন নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুমাত্রিক করার সুযোগ দেয়। তবে এর সঙ্গে রয়েছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতা বলছে, প্রতিটি দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী পদ্ধতিটি কার্যকর বা অকার্যকর হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের জন্যও এ বিতর্ক হয়তো নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার দ্বার খুলতে পারে, আবার অস্থিরতার ঝুঁকিও বয়ে আনতে পারে।

