আন্তর্জাতিকসর্বশেষ

মার্কিন হামলার পায়তারা ও ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা অবিরাম বৈরিতা

নিউজ ডেস্ক

এনভিবিডি24ডটকম

৩০ জানুয়ারি,২০২৬

পশ্চিমা শক্তিবর্গ ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহামমা মোসাদ্দিককে ১৯৫৩ সালে সামরিক অভ্যূত্থা ঘটিয়ে ক্সমতাচ্যুত করে। সেই থেকে তারা ইরানের সার্বভৈৗমত্বের প্রতি অসম্মান জানিয়ে আসছে। ১৯৭৯ ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর দেশটি তার স্বার্বভৌমত্ব ফিরে পায়। কিন্তু তা নস্যাতে পশ্চিমা চক্রান্ত বন্ধ হযনি। আরও বেড়েছে। আসন্ন মার্কিন হামলা তার চূড়ান্ত অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। মোসাদ্দেক পশ্চিম লুণ্ঠন থেকে দেশের তেল সম্পদ রক্ষায় তা জাতীয়করণ করেছিলেন। এই কারণে তাকে ক্ষমতাচ্যুত যুক্তরাষ্ট্র আর ব্রিটেন।

নিমোসাদ্দেক ১৯৫১ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, বিদেশি সরকারগুলো অথবা আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে অবদমিত আর করতে পারবে না। এর দুই বছর পর তাকে ক্ষমতা থেকে হটিযে দেয়া হয়।

এরপর সাত দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। এখন ইরানের আশপাশে ভারত মহাসাগরে মার্কিন হানাদার বিমানবাহি রণতরি ও গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন করা হয়েছে।.মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ভয়াবহ মার্কিন রণপ্রস্ততি দেখা যাচ্ছে। ইরানে হামলা চালানোর জন্য এই বিশাল রণসজ্জা। এই প্রেক্ষিতে মনে হচ্ছে , মোসাদ্দেকের ঘটনাটি ইতিহাসের কোন বিষয় নয় বরং লাইভ কেমেন্টারি ।

আকস্মিকভাবে যুদ্ধজাহাজগুলো মোতায়েন করা হয়নি। এর পেছনে রয়েছে বড় পরিকল্পনা। গোয়েন্দা তথ্যগুলো কেবল সত্য উদঘাটনের জন্য সংকলিত ও সম্প্রচার করা হয়েছে, তা নয়। বরং সামরিক হামলার ক্ষেত্র সৃষ্টির জন্য এটি করা হয়েছে,.যা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে বলা যায়,, ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রেকে জানিয়েছে যে, সম্প্রতি দেশব্যাপি বিক্ষোভ দমনের সময় আটক শত শত ইরানি বিক্ষোভকারীকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে ইরান সরকার। ইরানের বিরুদ্ধে এখন সাক্ষ্য প্রমান সরবরাহ করছে ইসরাইল, এটি হাস্যকর। ইরানের পরিস্থিতি ততটা খারাপ তা বলা যাবে না।

ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য ওয়াশিংটনের কাছে অবিরত তদবিরকারী দেশ হল ইসরাইল। তারা বলেছে, এই হামলার লক্ষ্য হবে ইরানের সরকার পরিবর্তন। মনে হচ্ছে, ইসরাইলের ওপর ইরানকে বিচার করার ভার দেওয়া হয়েছে।

তবে ইরানে যে সংকট নেই তা নয়। দশকের পর দশক ধরে চলা পশ্চিমা অবরোধে অর্থনৈতিক দুবরস্থার কারণে লোকজন রাস্তায় নেমে আসে। তাদের ক্ষোভ যথার্থ। বৈরি শক্তিগুলো এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিক্ষোভকে উস্কে দেয়ার চেষ্টা করে।

যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন আগ্রাসনের এই ধরণ নতুন কিছু নয়। ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলের নেতা জোয়াও গোলার্টের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটানো হয়। এরপর ১৯৭৩ সালে চিলিতে সালভেদর আলেন্দের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায় যুক্তরাষ্ট্র। এরআগে ১৯৬১ সালে কঙ্গোতে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে প্যাট্রিস লুমুম্বোকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করা হয়। আরব বসন্তের পর পাল্টা বিপ্লব ঘটনা ঘটানো হয়েছে। যা একই সূত্রে গাথা।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর থেকে যে কোন আন্দোলন পশ্চিমা স্বার্থের বিপক্ষে গেলে তাদের ওপর অবরোধের খড়গ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। যাতে অর্থনৈতিক সংকট বৃদ্ধি পায়।আভ্যন্তরিন অনৈক্য সৃস্টি হয় এবং নানাবিধ পাল্টা বিপ্লব সৃষ্টিতে গণমাধ্যমকে কাজে লাগাতে অর্থযোগান দেয়।

এসব চক্রান্তে কাজ না হলে পশ্চিমা শক্তি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করা হয়। তাতে কাজ না হলে সামরিক হামলা চালানো হয়। যুক্তি দেখানো হয় যে, তাদেরকে মুক্ত করতেই এই অভিযান চালানো হয়।

কেবল ইরানের রাজনৈতিক বিষয় নয়, এর পেছনে আরও অনেক বিষয় রয়েছে। তবে সেই পুরানো কৌশল আজ দেখা যাচ্ছে।

ইরান এই আগ্রাসনে ধারাকে কেবল তত্ত্ব হিসেবেই জানে তা নয়, বরং টিকে একটি জীবন্ত আতংক হিসেবেই দেখে। ১৯৫৩ সালে মোসাদ্দিক ছিলেন দেশটিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। তিনি নৃশংসভাবে দেশ শাসন করতে এই অজুহাতে সে সময় তার বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানো হয়নি। তিনি পশ্চিমা বা বৃটিশ লুন্ঠন থেকে দেশের তেলসম্পদ রক্ষায় তা জাতীয়করণ করেছিলেন। জাতীয়করণ করা কোম্পানির নাম ছিল এংলো-ইরানিয়ান কোম্‌পানি। পরে এটি বিপি নামে পরিচিত হয়। এই কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকা ইরানের নিজস্ব তেলসম্পদের মুনাফা থেকে ইরান তখন মাত্র ১৬ শতাংশ পেত।

জাতীয়করণে ক্ষিপ্ত ব্রিটেন ইরানের ওপর অবরোধ আরোপ করে, আবাদান তেলশোধনাগার বন্ধ করে দেয় এবং বিদেশি ক্রেতাদেরকে ইরানি তেল কিনতে বাধা দেয়। এভাবে পরকল্পিতভাবে দেশটিকে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে নিক্ষেপ করে।

অর্থনৈতিক যুদ্ধ যখন অপর্যাপ্ত মনে হয় তখন ব্রিটেন স্নায়ুযুদ্ধের অজুহাতে ইরানে হস্তক্ষেপ করতে সম্মত করায়। সিআইএ ইরানে অপতথ্য ছড়াতে থাকে। রাজনীতিকদের ঘুষ দেয় এবং ধর্মীয় নেতুবৃন্দকে হয়রানি করে। এভাবে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মোসাদ্দেককে ক্ষমতা থেকে হটানোর ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করে।

রেজাশাহ পাহলবিকে আবার সিংহাসনে বসানো হয়। তবে এখন সিআইএ স্বীকার করছে যে,ওই সামরিক অভ্যুত্থান অগণতান্ত্রিক।

ওই ঘটনা ইরানের রাজনৈতিক গতিপথকেই কেবল পরিবর্তন করেনি তার চলার পথ কেমন হবে তাও স্থির করে দিয়েছে।

সেই সাত দশক আগের কৌশল এখন নিয়েছে পশ্চিমা শক্তিবর্গ। মসজিদে আগুন দেয়ার ঘটনা বহিশক্তির ভুমিকাকে স্পষ্ট করছে। তারা ইরানি সমাজে বিভক্তি বাড়াতে চাচ্ছে।.

ইসরাইলি গণমাধ্যম বলছে এটি ইরান অস্থিতিশীল করার কোন গোপন কিছু নয়। ইরান সরকারের পতন ঘটলে সারা দেশে ব্যাপক বোমা হামলার মাধ্যমে সামরিক শক্তি পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়া হবে। যেমনটি বাশার আল-আসাদের পতনের পর দেশটি সব সামরিক শক্তি বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। তাই কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, দেশটিকে ধ্বংস করাই মার্কিন হামলা লক্ষ্য।

দীর্ঘ দু:সহ অবরোধ

১৯৭৯ সাল থেকে ইরানের ওপর অবরোধ আরোপ ও বহাল রাখা হয়েছে। আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন অবরোধের শিকার হয়েছে ইরান। সম্পদ আটক ও তেল বিক্রির ওপর নিধেষাজ্ঞা দিয়ে এই অবরোধের সূচনা হয়েছে। তারপর তা বিস্তৃত হয় অর্থ-বানিজ্য, জ্বালানি,প্রযুক্তি ও  দৈনিন্দন জীবনে।

১০৯০ দশকে এ অবরোধ আরও কঠোর  ও সম্প্রসারিত করা হয় সামরিক ক্ষেত্রে। ২০০৬ সালের পর অবরোধ আংশিক শিথিল করা হয়। ২০১৫সালে পারমানবিক চুক্তির পর ২০১৮ সালে ট্রাম্প পুণরায় সর্বাত্তক অবরোধ আরোপ করে।

চুক্তি অমান্য ও মানবাধিকার লংঘনের অজুহাত তুলে গতবছর ইউরোপীয় শক্তিবর্গ ইরানের স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতিসংঘের অবরোধ পণর্বহালের কৌশল গ্রহণ করে।

১৯৫১ সালের ব্রিটেনের কৌশলকে অনুসরণ করছে আমেরিকা। কঠোর অবরোধে যন্ত্রণা যে কত কষ্টকর তা কেবল ভুক্তভোগী দেশই জানে।

ইরানের ব্যাপারে মার্কিন আগ্রহের পেছনে রয়েছে দেশটি আধিপত্যবাদিী মনোভাব। ইরানের তেল কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, চীনে সঙ্গে ভৌগলিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে কৌশলগত হাতিয়ারও। চীন ২০২৫ সালে দৈনিক ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করেছে যা ইরানের রফতানি করা তেলের ১৩ শতাংশ।

. ১৯৭৯ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি ইমাম আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ইরানে ফিরে আসেন। বিদেশিদের বসানো রাজতন্ত্রের পতন ঘটে।তার এই আগমনের মধ্যদিয়ে ইরানে পরাধিনতার শৃঙ্খলমুক্ত হয়। রাজনৈতিক স্বাধীনতা ফিরে পায়।

বিপুল রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ইরানের সেই স্বাধীনতা হরনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্রাজ্যবাদী গোষ্টী আজ একত্রিত হয়েছে। (সূত্র: সুমাইয়া ঘানুষি,মিডলইস্টআই)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *