জাতীয়সর্বশেষ

খালেদা জিয়ার অবস্থা এখনো সংকটাপন্ন, স্থিতিশীল হলেই পাঠানো হবে বিদেশে

ছবি:সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক

এনভিবিডি24ডটকম

৩০ নভেম্বর, ২০২৫

বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা এখনো সংকটাপন্ন। ‘কিছুটা ভালো’ হলেও স্থিতিশীল নয়। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা চলছে। অবশ্য চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে গতকাল শনিবার বিএনপি জানায়, এ মুহূর্তে তার পরিস্থিতি বিদেশ নেওয়ার মতো নেই। তবে অবস্থা স্থিতিশীল হলে তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া হবে।

বিএনপি জানায়, দল থেকে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য লন্ডনকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অবশ্য বিকল্প হিসেবে অন্য একাধিক দেশের কথাও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এজন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্স, ভিসাসহ সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে।

এদিকে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক টিম পাঠানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে বন্ধুপ্রতিম দেশ চীন। দেশের মুরব্বি খ্যাত এই নেত্রীর শারীরিক অবস্থার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছে গোটা দেশবাসী। তার রোগমুক্তি কামনায় মসজিদে মসজিদে কোরআনখানি ও দোয়া মাহফিল আয়োজন করা হয়েছে। অন্য ধর্মীয় উপাসনালয়েও বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পোস্ট দিয়ে খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করছেন দেশবাসী।

দেশের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনা করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, দেশের রাজনৈতিক নেতারা দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ তার অসুস্থতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে রোগমুক্তি কামনা করছেন। লন্ডন থেকে তার বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন। খালেদা জিয়ার রোগমুক্তির জন্য দোয়া চেয়ে তারেক রহমান ও জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে।

গত ২৩ নভেম্বর ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়ার ফুসফুসে সংক্রমণ থেকে শ্বাসকষ্ট নিয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর দেখা দেয় নিউমোনিয়া। এর সঙ্গে আছে কিডনি, লিভার, আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসের পুরোনো সমস্যা। এতে পরিস্থিতি এমন যে একটি রোগের চিকিৎসা দিতে গেলে আরেকটির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) নেওয়া হয়।

অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে বর্তমানে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে। রাখা হয়েছে নিবিড় পর্যবেক্ষণে। নজর রাখছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। লন্ডন থেকে ডা. জুবাইদা রহমান এবং আমেরিকার জনস হপকিনস হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরাও ভার্চুয়ালি বোর্ডের আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।

বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার কারণেই খালেদা জিয়া এখন মৃত্যুশয্যায়। তারা বিএনপিপ্রধানকে কারাগারে স্লো পয়জনিং করে হত্যার চেষ্টার অভিযোগও তুলেছেন ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে।

গতকাল উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনা করে দোয়া মোনাজাত করা হয়। তার অসুস্থতার খবরে হাসপাতালে ছুটে যান অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টা। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতারা দফায় দফায় হাসপাতালে ছুটে গেছেন। এ সময়ে তাদের উদ্বিগ্ন দেখা গেছে। দলের পক্ষে তার চিকিৎসা সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান করছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। চিকিৎসক টিমের বাইরে তার সঙ্গে আছেন ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান।

খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনা করে বিএনপির পক্ষ থেকে শুক্রবার বাদ জুমা সারা দেশে দোয়া মোনাজাত করা হয়। ওইদিন নয়াপল্টন জামে মসজিদে দোয়া মাহফিলে মির্জা ফখরুল চিকিৎসকদের উদ্ধৃতি দিয়ে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটময় বলে উল্লেখ করেন। এর পরপরই সারা দেশে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। বিএনপির নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ হাসপাতালে ছুটে যান।

বিএনপি নেতাদের মধ্যে গতকাল দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম, ঢাকা উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক, যুবদল সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্নাসহ কয়েকজন নেতাকে হাসপাতালে দেখা গেছে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ ও স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া গতকাল খালেদা জিয়ার চিকিৎসার খোঁজ নিতে এভারকেয়ার হাসপাতালে ‍ছুটে যান। এর আগে শুক্রবার রাতে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার হাসপাতালে যান।

গতকাল খালেদা জিয়াকে দেখতে যান নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর, এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ, বিএলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত সেলিম এবং এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, প্রেসিডিয়াম সদস্য আলমগীর সিকদার লোটন, হাজি সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন, রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়াসহ বেশ কয়েকজন এবং এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ।

এছাড়া কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতা বিবৃতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনা করেছেন। তার রোগমুক্তি কামনা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন বিশিষ্ট ইসলামিক আলোচক মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী, দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে তানজীম আহমেদ সোহেল তাজ, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমসহ অনেকেই।

বিদেশে নেওয়ার অবস্থা নেই : ফখরুল

খালেদা জিয়া এখনো ‘সংকটাপন্ন’ অবস্থায় আছেন জানিয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থা এখনো সংকটাপন্ন। দেশের বিশিষ্ট চিকিৎসকদের পাশাপাশি আমেরিকার জনস হপকিনস এবং ব্রিটেনের লন্ডন ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও তার চিকিৎসায় পরামর্শ দিচ্ছেন।

বিদেশে নেওয়ার মতো শারীরিক অবস্থা নেই জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব জানান, শুক্রবার রাতে মেডিকেল বোর্ড দীর্ঘ বৈঠকে খালেদা জিয়ার সর্বশেষ চিকিৎসা পরিকল্পনা পর্যালোচনা করেছে। চিকিৎসকদের মতে, প্রয়োজন হলে বিদেশে নেওয়া লাগতে পারে। কিন্তু তার শারীরিক অবস্থা এখন সেই অবস্থায় নেই। আল্লাহর রহমতে যদি তিনি স্থিতিশীল হন, তখন বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা হবে।

অন্যান্য দল ও নেতাদের দোয়া

এছাড়া খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করে দেশবাসীর দোয়া চেয়েছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি শায়খুল হাদিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ও মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী। এছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিরা খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা ও তার জন্য দোয়া করেন।

নেতাকর্মীর স্রোত এভারকেয়ারে

খালেদা জিয়াকে দেখতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ হাসপাতালে ছুটছেন। দলের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালের সামনে নেতাকর্মীদের ভিড় কমছে না। পরে রিজভী নেতাকর্মীদের ভিড় না করার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানান।

চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারছেন : ডা. জাহিদ

গতরাতে সংবাদ সম্মেলনে ডা. জাহিদ বলেন, গত তিনদিন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা একই পর্যায়ে আছে। এটাকে আমরা ডাক্তারি ভাষায় যদি বলি- শি ইজ মেইনটেনিং দ্য ট্রিটমেন্ট, অর্থাৎ চিকিৎসকরা যে চিকিৎসা দিচ্ছেন, এ চিকিৎসা তিনি গ্রহণ করতে পারছেন। এ চিকিৎসা গ্রহণ করে তিনি যেন সুস্থ হয়ে যেতে পারেন, সেজন্য আপনারা সবাই দোয়া করবেন।

চীনের চিকিৎসক দল আসবে কাল

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামীকাল সোমবার চীনের একটি চিকিৎসক প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসছে। তারা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেবেন।

মেডিকেল বোর্ডের আরেক চিকিৎসক বলেন, ‘ধারাবাহিক ডায়ালাইসিসে আছেন খালেদা জিয়া। এই অবস্থার মূল কারণ হলো হৃৎপিণ্ডের মাইট্রাল ভাল্ব শক্ত হয়ে গেছে। এ কারণে হৃৎপিণ্ড রক্ত পাম্প করে শরীরের অঙ্গে পাঠাতে পারছে না। পাম্প করার সময়ে রক্ত ভাল্ব দিয়ে লিক করে শরীরে থেকে যাচ্ছে, যা থেকে তার ডান দিকের হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি তিনি সংক্রমণজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ায় জরুরি অবস্থা তৈরি হয়েছে। যে পরিস্থিতিতে সংক্রমণের বিরুদ্ধে তার শরীর অত্যধিক ও ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *