আন্তর্জাতিকসর্বশেষ

 

সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ নামে লাখ লাখ মানুষ হত্যার পর এবার যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেট ভেনেজুয়েলা 

সম্ভাব্য মার্কিন হামলা মোকাবিলায় ভেনেজুয়েলার প্রস্ততি। ছবি:সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক

এনভিবিডি24ডটকম

২৬ নভেম্বর, ২০২৫

সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে কয়েক দশক ধরে বেসামরিক নাগরিকদের ভীতসন্ত্রস্ত করার পর, এবার আরও কম নজরদারির মধ্যে একই কাজ করার চেষ্টা করছে হোয়াইট হাউস। এবার টার্গেট ভেনেজুয়েলা। সূত্র:

গত দুই মাস ধরে ভেনেজুয়েলার আশপাশে জড়ো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। বেসামরিক নৌযানের ওপর একের পর এক হামলা ও হত্যাকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে তারা। ‘মাদক সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে এ হামলার আদেশ দিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস। দৃশ্যত লাতিন আমেরিকার উপকূলজুড়ে মাদক পাচারে জড়িত সন্দেহভাজন যে কারোর ওপরই হামলা চালাতে এই তকমা দেওয়া হয়েছে। আগ বাড়িয়ে চালানো এসব হামলায় ইতিমধ্যে ৮০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সামরিক অভিযান সম্প্রসারণের আহ্বান জানাচ্ছে যুদ্ধবাজরা।

এই ঘটনাপ্রবাহ দেখে আমার মনে পড়ছে ভূগোলবিদ স্টুয়ার্ট এলডেনের পুরস্কারজয়ী ‘টেরর অ্যান্ড টেরিটরি’ বইয়ের একটি অংশের কথা। ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধকে’ কীভাবে অধ্যয়ন করতে হবে, সেটি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন এলডেন। তার পর্যবেক্ষণ হলো, সন্ত্রাসবাদকে শুধু রাষ্ট্রবহির্ভূত কোনো গোষ্ঠীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে যুক্ত করে দেখলে সেটাকে পুরোপুরি বোঝা যাবে না।

এলডেন বলেন, ‘রাষ্ট্রও স্পষ্টতই এমনভাবে কাজ করে যা মানুষের মনে ভীতি সঞ্চার করে। রাষ্ট্রবহির্ভূত পক্ষগুলোর সন্ত্রাসবাদ সামগ্রিকভাবে সন্ত্রাসের একটি খুবই সামান্য অংশ মাত্র, যেখানে রাষ্ট্রগুলো তাদের বিরোধিতাকারীদের চেয়ে অনেক বেশি মানুষকে হত্যা করেছে।’

উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গবেষণাও এলডেনের এই দাবিকে সমর্থন করে। উদাহরণ হিসেবে ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রকল্পের গবেষকেরা দেখিয়েছেন, ২০০১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে সরাসরি যুদ্ধ–সংক্রান্ত সহিংসতায় চার লাখের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। তারা আরও তথ্য–প্রমাণ দেখিয়েছেন যে এ যুদ্ধের কারণে পরোক্ষ মৃত্যু বিবেচনায় নিলে মোট মৃতের সংখ্যা ৩৫ লাখে পৌঁছায়। এর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধকবলিত এলাকায় সুপেয় পানি বা চিকিৎসা অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসাযোগ্য রোগে মানুষের মৃত্যু। আরও উল্লেখযোগ্য হলো, সরাসরি যুদ্ধকবলিত এলাকার বাইরেও একই সময়ে আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ছিল অত্যন্ত প্রাণঘাতী। দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এসব নিষেধাজ্ঞা বছরে প্রায় পাঁচ লাখ অতিরিক্ত মৃত্যুর কারণ হয়েছে।

মোদ্দা কথা হল, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বেসামরিক জনগণকে ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখার কয়েক দশক আমরা পার করেছি। এটা সবাই জানে, এরপরও ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস এখন নতুন মোড়কে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধকে’ পুনরুজ্জীবিত করছে। শুধু তা–ই নয়, অতীতে হত্যার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর যতটুকু তদারকি ছিল, তার চেয়েও কম তদারকির মাধ্যমে তারা এটি করার চেষ্টা করছে।

বাহ্যিক দৃষ্টিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ একের পর এক গোলকধাঁধাপূর্ণ কার্যনির্বাহী আদেশ আর সংস্কৃতি যুদ্ধের বিতর্কের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে মনে হলেও প্রশাসন আসলে একটি সুসংহত কর্তৃত্ববাদী নীলনকশা অনুসরণ করেছে। এর লক্ষ্য হলো প্রেসিডেন্টের হাতে অনেকটা সীমাহীন ক্ষমতা তুলে দেওয়া। এই সমন্বিত প্রচেষ্টাগুলো অভিবাসন থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা, অর্থনীতি, এমনকি কে নাগরিক হবে তা নির্ধারণ করার মতো অসংখ্য নীতির ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *