আন্তর্জাতিকসর্বশেষ

মধ্যপ্রাচ্য

ইসরাইলের গোপন কারাগার ‘রাকেফেত’এ কখনো সূর্যের আলো পৌঁছায় না

গাজা যুদ্ধবিরতির পর ইসরাইলের বিভিন্ন কারাগার থেকে মুক্ত ফিলিস্তিনিরা । ছবি: আল-মনিটর
নিউজ ডেস্ক
এনভিবিডি২৪ডটকম
১০ নভেম্বর, ২০২৫
মাটির নিচে একটি গোপন কারাগারে কয়েক ডজন ফিলিস্তিনিকে আটক করে রেখেছে ইসরাইল। সেখানে তারা কখনো সূর্যের আলো দেখতে পান না, পর্যাপ্ত খাবার পান না। পরিবার কিংবা বাইরের পৃথিবীর কোনো খবরও তাদের কাছে পৌঁছায় না।
ওই কারাগারে বন্দীদের মধ্যে অন্তত দুজন সাধারণ নাগরিক। তাদের মাসের পর মাস কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে। ওই দুই বন্দীর একজন পুরুষ নার্স। তাকে হাসপাতালের পোশাক পরা অবস্থায় আটক করা হয়। অন্যজন তরুণ খাবার বিক্রেতা। আইনি সহায়তা দানকারী প্রতিষ্ঠান পাবলিক কমিটি এগেইনস্ট টর্চার ইন ইসরাইলের (পিসিএটিআই) আইনজীবীরা তাদের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করছেন।
৩৪ বছর বয়সী ওই নার্সকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হাসপাতালে কাজ করার সময় আটক করা হয়। আর ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলি একটি তল্লাশিচৌকি থেকে আটক করা হয় তরুণ খাবার বিক্রেতাকে। আটক ওই দুই ব্যক্তিকে গত জানুয়ারিতে ভ‚গর্ভস্থ রাকেফেত কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। তারা সেখানে তাদের সঙ্গে সহিংস আচরণের এবং নিয়মিত মারধরের শিকার হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন।
ইসরাইলের সবচেয়ে দুর্র্ধষ অপরাধীদের আটক রাখার জন্য ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে রাকেফেত কারাগার চালু করা হয়। তবে কয়েক বছরের মধ্যেই অমানবিক আখ্যা দিয়ে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরাইলের উগ্রপন্থী নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির কারাগারটি পুনরায় চালুর নির্দেশ দেন।
কারাকক্ষ, ব্যায়ামের মাঠ কিংবা আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কক্ষ—সবই মাটির নিচে। ফলে প্রকৃতির আলো ছাড়াই এখানকার বন্দীদের বেঁচে থাকতে হয়।
পিসিএটিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, কড়া নিরাপত্তাবলয়ে রাখতে হয়, এমন অল্প কিছু বন্দীর জন্য প্রাথমিকভাবে রাকেফেত কারাগার তৈরি করা হয়েছিল। প্রত্যেক বন্দীর জন্য বানানো হয় পৃথক কক্ষ। ১৯৮৫ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় সেখানে ১৫ জন বন্দী ছিলেন। তবে সা¤প্রতিক মাসগুলোতে সেখানে আনুমানিক ১০০ বন্দীকে রাখা হয়েছে।
গত অক্টোবরে গাজা যুদ্ধবিরতির পর ইসরাইল তাদের আদালতে দোষী সাব্যস্ত ২৫০ জন ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেয়। এ ছাড়া গাজা থেকে আটক ১ হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই তাঁদের মাসের পর মাস আটক রাখা হয়েছিল। তাঁদের সঙ্গে মুক্তি পেয়েছেন রাকেফেত কারাগারে বন্দী থাকা খাবার বিক্রেতা ওই তরুণও।
তবে এখনো ইসরাইলের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত এক হাজার ফিলিস্তিনি আটক আছেন। রাকেফেত কারাগারে বন্দী ওই নার্স তাঁদেরই একজন। পিসিএটিআই বলেছে, আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ শেষ হলেও গাজার ফিলিস্তিনিদের এখনো ইসরাইলি কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন ও নির্যাতনের সমতুল্য।
পিসিএটিআইয়ের আইনজীবী জেনান আবদু বলেন, ‘আমরা যে মক্কেলদের সঙ্গে দেখা করেছিলাম, তারা দুইজন ছিলেন সাধারণ নাগরিক। আমি যার সঙ্গে কথা বলেছি, সে ছিল ১৮ বছর বয়সী খাবার বিক্রেতা। তাকে রাস্তায় একটি তল্লাশিচৌকি থেকে তুলে আনা হয়েছিল।’
গত অক্টোবরে গাজা যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েল তাদের আদালতে দোষী সাব্যস্ত ২৫০ জন ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেয়। এ ছাড়া গাজা থেকে আটক ১ হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই তাদের মাসের পর মাস আটক রাখা হয়েছিল। ইসরাইলি কারাগার পরিষেবা (আইপিএস) রাকেফেতের অন্যান্য বন্দীর পরিচয় ও অবস্থা সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়নি।
ইসরাইলি গোপন নথি অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে যেসব ফিলিস্তিনিকে গাজা থেকে আটক করা হয়েছিল, তাদের বেশির ভাগই সাধারণ নাগরিক। ২০১৯ সালে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়, ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য ফিলিস্তিনিদের লাশ রেখে দেওয়া আইনসম্মত। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, একইভাবে ইসরাইল জীবিত বন্দীদেরও ‘বিনিময়ের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
পিসিএটিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক তাল স্টেইনার বলেন, ইসরাইলের সব কারাগারেই ফিলিস্তিনি বন্দীদের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে রাখা হয়েছে। বর্তমান ও সাবেক বন্দী এবং ইসরাইলি সেনাবাহিনীর ভেতর থেকে তথ্য ফাঁস করে দেওয়া সদস্যরা সবাই এসব কারাগারে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছেন।
তবে রাকেফেত কারাগারে নির্যাতনের ধরন আলাদা। স্টেইনার বলেন, মাটির নিচে মাসের পর মাস বন্দী থাকা মানুষগুলো সূর্যের আলোর দেখা পান না। এতে তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। এমন শোষণমূলক ও প্রতিক‚ল পরিস্থিতিতে টিকে থাকা কঠিন। এটি শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর।
মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে ইসরায়েলের তেল আবিবের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত রামলার বিভিন্ন কারাগারে গেলেও সেখানে রাকেফেত কারাগার সম্পর্কে কিছুই জানতেন না স্টেইনার। বেন-গভির এটি আবার চালু করার আদেশ দেওয়ার পর তিনি প্রথম কারাগারটির কথা শোনেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *