আন্তর্জাতিকসর্বশেষ

‘র’-এর গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্রে বিপর্যস্ত দিল্লির গোয়েন্দা উচ্চাভিলাস

নিউজ ডেস্ক

এনভিবিডি24ডটকম

২৪ মে, ২০২৬

ভারতে শিখদের পৃথক রাষ্ট্র ‘খালিস্তান’ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নেতা ও যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে বসবাসরত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক ভারতীয় নাগরিক নিখিল গুপ্ত মার্কিন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ম্যানহাটানের একটি ফেডারেল আদালতে তিনি এই স্বীকারোক্তি দেন। এতে তিনি জানিয়েছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নিয়ন্ত্রিত বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র)-এর এক কর্মকর্তার নির্দেশে পান্নুনকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। সূত্র: দ্য ইন্টারপ্রেটার  

তার এই স্বীকারোক্তি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। আগামী সপ্তাহে ২৯ মে এই মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। রায়ে আদালত নিখিল গুপ্তকে ১৯ থেকে ২৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং একই সঙ্গে ৫ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত জরিমানা করতে পারে।

নিখিল গুপ্তের এই স্বীকারোক্তি এমন একসময়ে আসে, যখন মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে) অভিযোগ করে যে, এটি কোনো অরাষ্ট্রীয় শক্তি পরিচালিত একটি পরিকল্পিত গণপিটুনি ছিল না বরং এটি ছিল গুপ্তহত্যার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা, যাতে বিকাশ যাদব নামে একজন ‘ভারতীয় সরকারি কর্মচারী’র সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এই বিকাশ যাদবই পান্নুনকে হত্যার জন্য ২০২৩ সালে নিখিল গুপ্তকে নিয়োগ করেছিলেন। সে সময় বিকাশ যাদব ভারতের মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ে কর্মরত ছিলেন। তিনি ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র)-এর একজন ‘সিনিয়র ফিল্ড অফিসার’ হিসেবে পরিচিত। সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ভারতের ‘নিরাপত্তা’ ও ‘গোয়েন্দা ব্যবস্থাপনা’র সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ‘র’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কার্যালয় সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

গুপ্তর স্বীকারোক্তির পর ভারতের একজন সরকারি কর্মকর্তার কথিত সম্পৃক্ততা নিয়ে মোদি সরকার কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। ২০২৩ সালে মার্কিন কর্তৃপক্ষ গুপ্তর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার পর এই মামলার তথ্য তদন্তের জন্য নয়াদিল্লিতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্তে এমন ‘বিপথগামী কর্মীদের’ সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, যারা সরকারি অনুমোদন ছাড়াই কাজ করেছিলেন।

 তদন্তের ফল অবশ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভারতের ভবিষ্যৎ প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা শক্তিশালী করার জন্য পদ্ধতিগত সংস্কারের আহ্বান জানায়।

নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে গর্ব করা ভারত ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে, টার্গেট করে হত্যাকাণ্ড সরকারি নীতি ছিল না। কিন্তু মার্কিন আদালতে ভারতীয় নাগরিকের গুপ্তহত্যার চক্রান্ত করার দোষ স্বীকার করে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এবং সাজার আসন্ন রায় বিদেশের মাটিতে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে নয়াদিল্লিকে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে।

চেক প্রজাতন্ত্র থেকে গ্রেপ্তার ও প্রত্যর্পণের পর নিখিল গুপ্ত বর্তমানে মার্কিন কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রয়েছেন। এই প্রথমবার নয় যে ভারতীয় কর্মকর্তারা তাদের ‘কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে চিহ্নিত দেশগুলোয় এ ধরনের কার্যকলাপের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছেন। ২০২০ সালে অস্ট্রেলিয়া দুজন ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করেছিল, যারা অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং বিমানবন্দর নিরাপত্তা প্রটোকল সম্পর্কিত সংবেদনশীল তথ্যে প্রবেশাধিকার পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

তবে নয়াদিল্লি এসব দাবিকে ‘অনুমানমূলক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল এবং চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রকাশ্য কোনো রেকর্ড ভারতের নেই। একই বছর জার্মান প্রসিকিউটররা ‘র’-এর হয়ে শিখ সম্প্রদায় এবং কাশ্মীরি কর্মীদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে একজন ভারতীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন।

অন্যদিকে, ২০২৩ সালে কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ভ্যাঙ্কুভারের কাছে খালিস্তান আন্দোলনের কর্মী হরদীপ সিং নিজ্জারের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারত সরকারের যুক্ত থাকার অভিযোগ যখন করেন, তখনো নয়াদিল্লি এই অভিযোগকে ‘অযৌক্তিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। এর ফলে কানাডার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং উভয় দেশই তাদের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকদের পাল্টাপাল্টি বহিষ্কার করে। তবে কানাডার নতুন প্রধানমন্ত্রী কার্নির প্রশাসনের অধীনে দেশটির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হয়েছে। এ বছরের শেষ নাগাদ কানাডার সঙ্গে ভারতের একটি বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা-সংক্রান্ত পদক্ষেপ গ্রহণেও সম্মত হয়েছে দুই দেশ।

বাইডেন প্রশাসনের সময় পান্নুন হত্যা ষড়যন্ত্র তদন্তের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে তাৎক্ষণিক যে বিরূপ প্রভাব পড়েছিল, তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছিল। তবে বিষয়টি নিয়ে ভারতের সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছিল। এই অভিযোগে মার্কিন কংগ্রেস ভারতের কাছে সশস্ত্র ড্রোন বিক্রির একটি চুক্তি আটকে দিয়েছিল। মামলাটি যথাযথভাবে তদন্ত করা হবে বলে হোয়াইট হাউস ‘আশ্বাস’ দেওয়ার পরেই শুধু কংগ্রেস এটির অনুমোদন দিয়েছিল।

২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তার প্রশাসন এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে এই মামলাটি নিয়ে সরাসরি কথা বলা থেকে বিরত থেকেছে। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে একমাত্র আনুষ্ঠানিক বিবৃতিটি আসে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোদি-ট্রাম্প বৈঠকের আগে। সে সময় গণমাধ্যমের এক প্রশ্নের জবাবে একটি অস্পষ্ট উত্তর দেওয়া হয়, যেখানে আশ্বাস দেওয়া হয় যে, ‘প্রত্যেক আমেরিকানের নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করা ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকার। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানির ওপর উচ্চ শুল্কারোপ এবং ২০২৫ সালের মে মাসের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক যথেষ্টই তিক্ত হয়েছে।

বিভিন্ন দেশে দমন-পীড়নে ভারত সরকারের জড়িত থাকার প্রমাণ দেশটিকে ভুক্তভোগী থেকে অপরাধী হিসেবেই তুলে ধরেছে। তবে, নিখিল গুপ্তর সাজা হয়তো এ বিষয়ের শেষ নয়। নয়াদিল্লি গুপ্তর সঙ্গে কোনো ধরনের সংযোগের কথা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করলেও মোদি সরকার পরোক্ষভাবে বিকাশ যাদবের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চাকরি করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

মার্কিন বিচার বিভাগ বিকাশ যাদবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে এবং তিনি ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় ও ইন্টারপোলের রেড নোটিসের আওতায় রয়েছেন। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিকাশ যাদব দিল্লিতে একটি অপহরণ ও চাঁদাবাজি-সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে মুক্ত হয়ে ভারতেই আছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

আদালতে নিখিল গুপ্তর স্বীকারোক্তি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যর্পণ চুক্তির ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একটি শক্ত ভিত্তি দেওয়ায় মার্কিন বিচার বিভাগের জন্য এখন বিকাশ যাদবকে প্রত্যর্পণের দাবি জানানোর পথ সুগম হয়েছে। তবে, এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের কোনো অনুরোধ জানানো হয়েছে কিনা তা জানা যায়নি। কিন্তু মোদি-ট্রাম্প সম্পর্কের দৃশ্যমান ফাটলের কারণে বাইডেনের মতো ট্রাম্প এ বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসের চাপ এড়াতে ততটা আগ্রহী হবেন বলে মনে হয় না।

এমনকি একজন ‘বিপথগামী গুপ্তচর’ জড়িত থাকার নয়াদিল্লির দাবি সত্ত্বেও এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো খারাপভাবেই তুলে ধরেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি ২০২৫ সালের পেহেলগাম হামলার পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতা জোরদার করার জন্য ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতাকেও বাধাগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে এটি ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের গোয়েন্দা ও বিশেষ অভিযানবিষয়ক উপকমিটির সুপারিশ অনুযায়ী গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানসংক্রান্ত ‘ফাইভ আইজ’ নামের চুক্তিতে ভারতের যোগদানের সম্ভাবনাকে হ্রাস করেছে।

এ ধরনের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের আস্থার ঘাটতিকে স্বাভাবিকভাবেই আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে তা এটাও মনে করিয়ে দেয় যে, ভারত সেই অল্প কয়েকটি গণতান্ত্রিক দেশের একটি, যার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ওপর দেশটির সংসদীয় কোনো তদারকি নেই।

যুক্তরাষ্ট্রে সক্রিয় খালিস্তান আন্দোলন থেকে উদ্ভূত ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রতি পশ্চিমাদের উদাসীনতা নিয়ে সবসময়ই সোচ্চার থেকেছে নয়াদিল্লি। কিন্তু ভারত সরকার যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় দমনপীড়নে জড়িত, সেই অভিযোগের সমর্থনে থাকা যথেষ্ট প্রমাণ ভারতকে সহিংসতার শিকার হওয়ার পরিবর্তে বরং অপরাধী হিসেবেই তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে গুপ্ত হত্যার চক্রান্তের ঘটনা নিয়ে নয়াদিল্লির জবাবে বা বক্তব্যে এই অভিযানটি কীভাবে এবং কার অনুমোদনে পরিচালিত হয়েছিল তার একটি আনুষ্ঠানিক হিসাব অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *