জাতীয়সর্বশেষ

সুব্রত কন্যা ‘গ্যাং মাদার’ খ্যাত বীথি গ্রেপ্তার

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
এনভিবিডি24ডটকম
১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫

শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের মেয়ে সিনথিয়া বীথিকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। সোমবার র‍্যাব-১১ এর একটি টিম কুমিল্লা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। বাবার দীর্ঘ কারাবাসের সুযোগে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ কার্যত তার হাতেই ছিল, ফলে আন্ডারওয়ার্ল্ডে তিনি ‘গ্যাং মাদার’হিসেবে পরিচিতি পান। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই গ্রেপ্তার কেবল একটি সন্ত্রাসী পরিবারের সদস্যকে আইনের আওতায় আনার ঘটনা নয়; বরং এটি দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ, আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাসী যোগসূত্র এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে অপরাধ জগতের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ।

উচ্চপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাজধানী ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সক্রিয় সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র, বিদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসী দলের সঙ্গে লেনদেন—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে তার কাছ থেকে। গ্রেপ্তারের পর তাকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)-এর কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। প্রাথমিকভাবে র‍্যাব তার নিয়ন্ত্রণে থাকা অস্ত্রভাণ্ডার, কিলার টিম এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য উদ্ধারের চেষ্টা করছে।

‘গ্যাং মাদার’হিসেবে উত্থান

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সিনথিয়া বীথি সুব্রত বাইনের উত্তরাধিকারী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন না; বরং পিতার দীর্ঘ কারাবাসের সময়ে তিনি আন্ডারওয়ার্ল্ডে ‘গ্যাং মাদার’হিসেবেও পরিচিতি পান। বাবার অনুপস্থিতিতে অত্যন্ত কৌশলে তিনি পুরো নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন। অভিযোগ রয়েছে, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অবৈধ অর্থ লেনদেনসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, সুব্রত বাইন কারাগারে থাকলেও তার সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য দুর্বল হয়নি—বরং সিনথিয়া বীথির মাধ্যমে তা নতুন আঙ্গিকে পরিচালিত হচ্ছিল। তিনি ছিলেন প্রযুক্তিনির্ভর, কৌশলী ও অনেক ক্ষেত্রে আরো আগ্রাসী। বাবার রেখে যাওয়া অস্ত্রভাণ্ডার ও প্রশিক্ষিত ঘাতক দলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখে দূর থেকেই অপরাধ কার্যক্রম সচল রাখতেন তিনি।

ভারতীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসাজশ

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিনথিয়া বীথির কর্মকাণ্ড দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার বিরুদ্ধে ভারতের কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও অপরাধচক্রের সঙ্গে গোপন যোগাযোগের তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এই আন্তঃদেশীয় সংযোগের মাধ্যমে অস্ত্র ও অর্থ পাচার, সীমান্তপথে কুরিয়ার নেটওয়ার্ক এবং হাওয়ালা-ধাঁচের অর্থপ্রবাহ পরিচালিত হতো বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

তার ডিজিটাল ডিভাইস ও কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি, ভারতে পলাতক কিছু বাংলাদেশি রাজনৈতিক নেতা ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু আইনশৃঙ্খলা সমস্যা নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও তৈরি করবে।

ব্যক্তিগত জীবন থেকে অপরাধের কেন্দ্রবিন্দু

বীথি সুব্রত বাইনের তিন স্ত্রীর মধ্যে স্ত্রী লুসির বড় সন্তান। তার ভাইয়ের নাম তৌকীর আলী রিপন। তিনি একসময় বাবার গাড়িচালক ওসমানের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেন। ধারণা করা হয়, এই সম্পর্কের মাধ্যমেই ওসমান অপরাধ জগতে প্রবেশ করেন। তবে বর্তমানে সেই সম্পর্ক টিকে আছে কি না বা ওসমানের বর্তমান অবস্থান কী—সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

জুলাই বিপ্লবীদের ওপর হামলার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ

বীথির গ্রেপ্তারের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, তাহলো সাম্প্রতিক ‘জুলাই বিপ্লবীদের ওপর হামলা ও হুমকির সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না’- তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে, জুলাই বিপ্লবের অন্যতম আইকন শরীফ ওসমান হাদির ওপর ছাত্রলীগ ক্যাডার ফয়সাল করিম মাসুদ (ছদ্মনাম-দাউদ বিন ফয়সাল) এর গুলির সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ড এবং ভারতীয় সন্ত্রাসবাদী গ্রুপগুলোর সংযোগের বিষয়ে জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে র‍্যাব ও ডিবির যৌথ তদন্তে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। সামনে চ্যালেঞ্জ হলো—তার নিয়ন্ত্রিত অস্ত্রের গুদাম, কিলার টিমের সদস্য, অর্থ জোগানদাতা ও আশ্রয়দাতাদের শনাক্ত করা এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেওয়া।

গোয়েন্দা মহলের মতে, সিনথিয়া বীথির গ্রেপ্তার শুধু একজন নারী সন্ত্রাসীর পতন নয়; এটি আধুনিক আন্ডারওয়ার্ল্ড, আন্তর্জাতিক অপরাধ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার জটিল সংযোগ উন্মোচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। তার জবানবন্দির ভিত্তিতে সামনে আরো গ্রেপ্তার ও বড় ধরনের অভিযান আসতে পারে—এমন আভাসও দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *