জাতীয়সর্বশেষ

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু, ১০ জনই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা

নিজস্ব প্রতিবেদক

এনভিবিডি24ডটকম

২৯ মার্চ, ২০২৬

লিবিয়া থেকে ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে গ্রিসের উপকূলে একটি নৌকায় ছয়দিন ধরে ভাসতে থাকা ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাহনটির বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা। তাদের মধ্যে ১০ জনের বাড়ি সিলেটের সুনামগঞ্জে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

জানা গেছে, নিহত ১০ জনের মধ্যে পাঁচজনজগন্নাথপুরের । তারা হলেন—পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান (৩৫), টিয়ারগাঁওয়ের শায়ক মিয়া (২০), ইছগাঁওয়ের মো. আলী, বাউরি গ্রামের সুহানুর এবং পৌরসভার কবিরপুর গ্রামের নাঈম।

দিরাই উপজেলার চারজন হলেন- জাহানপুর গ্রামের মুজিবুর রহমান (৪০), তারাপাশা গ্রামের মো. সাহান (৩৩), সাজিদুর রহমান (২৮), নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০) এবং দোয়ারার দোহালিয়ার পানাইল গ্রামের ফাহিম (২২)। এছাড়া করিমপুর ইউনিয়নের তারেক (২২) নামে একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

জানা যায়, এ মানবপাচারের পেছনে রয়েছে একটি সক্রিয় সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক দালালচক্র। স্থানীয়ভাবে ছাতক থানার দুলাল মিয়া ও তার ভাই বিল্লাল এর হোতা। অভিযোগ রয়েছে, গ্রিসে অবস্থানরত বিল্লাল বিদেশ থেকে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। আর দেশে থেকে দুলাল মিয়া যুবকদের ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে নেন।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমিনুর রহমান ১১ লাখ টাকার চুক্তিতে এ পথে যাত্রা শুরু করেন। তিন দিনের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর আশ্বাস দিলেও তাকে প্রায় তিন মাস লিবিয়ার বিভিন্ন গোপন আস্তানায় আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন করা হয়।

জীবিত উদ্ধার হওয়া এক যাত্রী জানান, বড় জাহাজের প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত তাদের ছোট প্লাস্টিক ও রাবারের বোটে তুলে দেওয়া হয়। প্রতিকূল আবহাওয়ায় পথ হারিয়ে ছয়দিন খাবার ও পানীয় ছাড়াই সমুদ্রে ভাসতে থাকেন তারা। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ঠান্ডা ও ক্লান্তিতে একে একে প্রাণ হারান অনেকে। পরে পাচারকারীদের নির্দেশে লাশগুলো সাগরেই ফেলে দেওয়া হয়।

এদিকে, জগন্নাথপুর, দিরাই ও দোয়ারার এ তরুণদের মৃত্যুতে পুরো সুনামগঞ্জে চলছে শোকের মাতম। এলাকাবাসী দালাল সিন্ডিকেটের হোতাসহ সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানিয়েছেন।

গত শুক্রবার গ্রিসের কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত ও উপকূলীয় রক্ষা বাহিনী ফ্রন্টেক্সের একটি জাহাজ গ্রিসের বৃহত্তম এবং ভূমধ্যসাগরের পঞ্চম বৃহত্তম দ্বীপ ক্রিটের কাছ থেকে ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থার একটি জাহাজ জীবিত অবস্থায় ২৬ জনকে উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজন নারী ও এক শিশুও রয়েছে।

কোস্ট গার্ড পরে এএফপিকে জানায়, ওই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে ২১ জন বাংলাদেশি, ৪ জন দক্ষিণ সুদানি এবং চাদের একজন নাগরিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

জীবিতদের বরাতে গ্রিসের কোস্ট গার্ড জানায়, রাবারের নৌকাটি ২১ মার্চ পূর্ব লিবিয়ার বন্দরনগরী তোবরুক বন্দর থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেয়। ছয়দিন ধরে খাবার ও পানীয় ছাড়াই সমুদ্রে ভাসতে থাকায় যাত্রীরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন। প্রতিকূল আবহাওয়া, খাদ্য ও পানির সংকটে ২২ জনের মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় সন্দেহভাজন দক্ষিণ সুদানের দুই পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করেছে গ্রিক কর্তৃপক্ষ। তাদের বয়স যথাক্রমে ১৯ ও ২২ বছর। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ ও অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে তদন্ত চলছে।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই ইউরোপে অভিবাসনের চেষ্টাকালে সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ভূমধ্যসাগরে ৫৫৯ জন মারা গেছেন। গত বছর একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২৮৭।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয়ের সন্ধানে আসা বহু অভিবাসীর জন্য গ্রিস একটি প্রধান প্রবেশদ্বার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *