ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ও ভূরাজনৈতিক কৌশল
নিউজ ডেস্ক
এনভিবিডি24ডটকম
৩১ জানুয়ারি, ২০২৬
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক। সেভেন সিস্টারস, শিলিগুড়ি করিডোর ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশ ভারতের কাছে ভূকৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে সার্বভৌম প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবে বিবেচনার বদলে ভারতের কাছে বাংলাদেশ ছিল একটি ক্লায়েন্ট স্টেট। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ওপর ভারতের একচেটিয়া আধিপত্য খর্ব হয়েছে।
অতীতে বাংলাদেশে নানা সময়ে নানা কায়দায় সরকার বদল হয়েছে, তবে এবারের মতো প্রতিক্রিয়া ভারত আগে কখনো দেখায়নি। এর থেকে স্পষ্ট, বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ভারতের সঙ্গে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্ক এক গভীর অবিশ্বাস ও চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মূল কারণ প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারতের প্রতি বাড়তে থাকা অবিশ্বাস, যা জন্ম নিয়েছে ভারতের দিক থেকে আসা অহেতুক নিরাপত্তাকেন্দ্রিক ভীতি, প্রোপাগান্ডা, হিন্দুত্ববাদের উত্থান এবং বিজেপির আগ্রাসী নেতৃত্বের ভাষা থেকে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন ও ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক মুখ থুবড়ে পড়ে। গত দেড় বছরের ঘটনাপ্রবাহ দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একের পর এক ষড়যন্ত্র, অভিযোগ, প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে। ২৪-এর অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছে, তা ঐতিহাসিকভাবে খুবই বিরল। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পরও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এতটা শীতল ছিল না। সে সময় ভারত কোনো ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেয়নি, বাণিজ্যেও বাধা সৃষ্টি করেনি।
সামরিক শাসনামলেও সম্পর্ক স্বাভাবিক ছিল। অথচ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বর্তমানে ভিসাপ্রক্রিয়া প্রায় সম্পূর্ণরূপে বন্ধ, প্রয়োজনীয় খাদ্য ও চিকিৎসাপণ্য রপ্তানি বাধার মুখে পড়ছে। সংখ্যালঘু নিপীড়নে বিশ্বের অন্যতম সমালোচিত দেশ ভারতে একের পর এক মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। সেটির সমাধান না করে প্রতিবেশী দেশের সংখ্যালঘু ইস্যু নিয়ে অপরাজনীতিতে মেতেছে ভারত। এ নিয়ে ভারত একের পর এক যে নৈরাজ্যপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করছে।
ভিয়েনা কনভেনশনের ২২ নম্বর ধারা লঙ্ঘন করে আগরতলায় বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনে হামলা চালিয়েছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু সংঘর্ষ সমিতি। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনটির নেতাকর্মীরা সহকারী হাইকমিশনের ভেতরে ঢুকে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালালেও সেখানকার নিরাপত্তারক্ষীরা নিষ্ক্রিয় থাকা এবং উন্মাদের মতো রাগ-ক্ষোভ ঝাড়ার ধরন দেখে বোঝা যাচ্ছে, অভ্যুত্থান ঘটানো ছাত্র-জনতা ভারতের কলোনি থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেছে।
এর আগে নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, আফগানিস্তানে প্রভাব হারিয়েছে ভারত। বাংলাদেশই ছিল ভারতের সর্বশেষ দাদাগিরিস্থল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ফলে গত ৫ আগস্ট সেটিও ছুটে গেছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারতের উন্মাদের মতো কূটনীতিবহির্ভূত এলোমেলো আচরণ দেখে এটা স্পষ্ট যে, তারা একে মেনে নিতে পারেনি। ভারতের নীতিনির্ধারকরা মুখে বন্ধুত্বের কথা বললেও বাস্তবে তাদের অনেকের মধ্যে বৈরী আচরণই বেশি লক্ষণীয়।
লেখক: ড. মোহাম্মদ আবদুর রব

