আন্তর্জাতিকসর্বশেষ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় রয়েছে যে বড় পাঁচটি বিষয়

নিউজ ডেস্ক

এনভিবিডি24ডটকম

১২ এপ্রিল, ২০২৬

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনার জন্য প্রস্তুত ইসলামাবাদ। আলোচনাকে সামনে রেখে শহরে মোতায়েন করা হয়েছে নিরাপত্তারক্ষী। রাস্তার প্রবেশপথের ফুটপাত নতুন করে হলুদ ও কালোতে রঙিন করা হয়েছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তান সরকার যুদ্ধবিরতির আলোচনায় আশাবাদী। তারা জোর দিয়ে বলছে, অন্য অনেক দেশের তুলনায় তারা উভয়পক্ষেরই আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির  এক  বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে একথা বলা হয়েছে। শনিবার শুরু হওয়া আলোচনা আজ রোববারও চলবে। আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা গেছে। আলোচনার পাশাপাশি যুদ্ধের জন্যও দুই পক্ষই প্রস্তত রয়েছে।

ইরানের সঙ্গে শনিবার শুরু হওয়া ইসলামাবাদের ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, তিনিও আশার কথা শুনিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার আগে তিনি বলেন, ইরান যদি সৎভাবে আলোচনা করতে প্রস্তুত থাকে, তাহলে অবশ্যই আমরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেব। একই সঙ্গে সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন, যদি তারা আমাদের সঙ্গে কোনো ধরনের গেম খেলার চেষ্টা করে, তাহলে তা আলোচনায় কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না। সত্যি বলতে, এ আলোচনা সফল হওয়া নিয়ে পাহাড়সম বাধাও রয়েছে।

লেবানন

ইরানের মিত্র লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের চলমান হামলা যুদ্ধবিরতির আলোচনা সফল হওয়ার পথে হুমকি তৈরি করেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, ইসরাইল লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখলে আলোচনা অর্থহীন হয়ে পড়বে। ইসরাইলকে হুমকি দিয়ে তিনি আরো বলেন, আমাদের আঙুল ট্রিগারের ওপরই আছে। ইরান কখনোই লেবাননের ভাইবোনদের ছেড়ে যাবে না।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রে ‘কোনো যুদ্ধবিরতি নেই’, তবে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দাদের বারবার এলাকা ছাড়ার সতর্কবার্তা দেওয়া সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত সেখানে আর বড় কোনো সামরিক হামলা চালানো হয়নি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, লেবাননে ইসরাইলের হামলা এখন আগের তুলনায় ‘কিছুটা কম তীব্র’ হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এ পদক্ষেপ ইরানকে খুশি করতে নামকাওয়াস্তে হবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

হরমুজ প্রণালি

শুরুতেই যে বিষয়টি যুদ্ধবিরতির আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে তার একটি হরমুজ প্রণালি। ট্রাম্প বলেছেন, ইরান শুরুতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার কথা বললেও এখন তারা নিয়ন্ত্রণ করছে। ট্রুথ সোশ্যালে তিনি বলেন, এটা আমাদের চুক্তি ছিল না। ইরান ঠিক কাজ করেনি।

বর্তমানে খুব অল্পসংখ্যক জাহাজই হরমুজ অতিক্রম করতে পারছে। শত শত জাহাজ এবং আনুমানিক ২০ হাজার নাবিক এখনো পারস্য উপসাগরের ভেতরে আটকে রয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর ইরান এটিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে। তারা এটিকে নিজেদের সার্বভৌম জলসীমা হিসেবে দাবি করছে এবং কোন জাহাজ চলাচল করতে পারবে আর কোনটি পারবে না, তা নির্ধারণে নতুন নিয়ম প্রণয়নের কথা বলছে।

বৃহস্পতিবার ইরান ঘোষণা দিয়েছে, বিদ্যমান দুটি ট্রাফিক চ্যানেলের উত্তরে নতুন ট্রানজিট রুট তৈরি করা হয়েছে। শিপিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিদ্যমান উদ্বেগকে সামনে রেখে এক বিবৃতিতে বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে বিভিন্ন ধরনের জাহাজবিধ্বংসী মাইনের উপস্থিতি এড়াতেই নতুন এ রুট জরুরি ছিল।

সম্প্রতি কিছু জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করতে ২০ লাখ ডলার (প্রায় ১৫ লাখ পাউন্ড) টোল দিয়েছে—এমন প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যেন ট্যাংকারগুলোর কাছ থেকে কোনো ফি না নেয়।

পারমাণবিক শক্তি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘদিনের বিরোধের বিষয়টি হলো পারমাণবিক ইস্যু। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না, এ নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য তিনি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করেছেন।

ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার চেষ্টা করেনি—যদিও অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ এ দাবিকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখে। তবে তারা জোর দিয়ে বলছে, পারমাণবিক অস্ত্র নয় বরং এনপিটি স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে শান্তিপূর্ণ কাজে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে।

এদিকে ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব নিয়ে যুদ্ধবিরতির আলোচনাকে ট্রাম্প কার্যকর ভিত্তি বলে উল্লেখ করেছেন। যদিও তাতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি রয়েছে।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের নিজস্ব ১৫ দফা পরিকল্পনায় দাবি করা হয়েছে, ইরানের মাটিতে সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না এমনকি তা অর্জনের সক্ষমতাও তৈরি করতে পারবে না।

এ জটিল বিষয়টি সমাধান করতে আন্তর্জাতিক আলোচকদের ২০১৫ সালের যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) চুক্তিতে পৌঁছতে বহু বছর সময় লেগেছিল, যেখানে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে সমাধান করা হয়। এ অবস্থায় আবারও ইস্যুটি নিয়ে নতুন করে দুদেশ আলোচনায় প্রস্তুত কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।

ইরানের আঞ্চলিক মিত্র

ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের অন্যতম হলো লেবাননের সশস্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি, গাজার হামাস এবং ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়া বাহিনী। যারা তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে সহযোগিতা করছে। এর ফলে ইরান ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনও চলছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর এ মিত্র শক্তিগুলোও (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স) নিয়মিত হামলার সম্মুখীন হচ্ছে। ইরানের আরেক মিত্র সিরিয়ার সাবেক স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদও আগেই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরাইল ইরানের এ মিত্র শক্তিগুলোকে ‘অ্যাক্সিস অব ইভিল’ হিসেবে দেখে, যা তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি এবং এদের সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা জরুরি বলে মনে করে তারা।

যখন ইরানের অর্থনীতি চাপে পড়ছে, তখন অনেক ইরানি নাগরিকও চান যে তাদের সরকার বিদেশে প্রভাব বিস্তারের পেছনে কম খরচ করে বরং দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার দিকে বেশি মনোযোগ দিক। যদিও ইরান তাদের মিত্রদের থেকে সরে আসতে প্রস্তুত এমন কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

ইরানের ইসলামিক শাসনব্যবস্থা বহু দশক ধরে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়েছে। ফলে যখনই কোনো আলোচনায় শর্তের বিষয়টি সামনে আসে, তখন তারা আন্তর্জাতিক এ নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে।

শুক্রবার ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, আলোচনা শুরুর আগেই প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলারের জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্ত করতে হবে।

তবে ৭ এপ্রিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন, সেখানে জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। ফলে গালিবাফ কোন চুক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, তা স্পষ্ট নয়। ধারণা করা হচ্ছে, কেবল আলোচনা শুরুর জন্য ট্রাম্প প্রশাসন এত বড় ছাড় দিতে খুব একটা আগ্রহী নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *