আন্তর্জাতিকসর্বশেষ

প্রতিক্ষণ চরম ভীতি ও বিরামহীন হতাশায় কাটে ভারতের মুসলমানদের জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক

এনভিবিডি24ডটকম

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ভারতীয় লেখক, অনুবাদক ও ইতিহাসবিদ রাখশান্দা জলিল প্রতি বছর গয়ায় অনুষ্ঠিত শিল্প ও সাহিত্য উৎসবে যোগ দেন। চলতি বছর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাহিত্য উৎসবেও যোগ দেন তিনি। উৎসবটিতে তিনি যতবার আসেন ততবারই মুগ্ধ হন; কারণ এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা বলার এবং নিজেদের তুলে ধরার একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।

রাখশান্দা জলিল বলেছেন, ‘সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে আমি নিজের পরিচয় তৈরির একটি জায়গা খুঁজে পেয়েছি। বর্তমান সময়ে আমাদের দেশের ওপর অন্যের শক্তি কালো মেঘের মতো ‍জুড়ে রয়েছে, যা নিয়ে আমার মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।’ উৎসবে এসেও সেসব বিষয় নিয়ে মন খুলে কথা বলতে বেশ অস্বস্তিবোধ করছিলেন তিনি। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হয়েছে এই উৎসবই সেই ‘ভয়’ নিয়ে কথা বলার উপযুক্ত জায়গা। নিজের মনের কথা, অন্ধকার ভয়ের কথা এখানে না বললে আর কোথায় বলা যাবে? সেই ভাবনা থেকেই ভয় নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন তিনি।

রাখশান্দা বলেন, ‘আমি ভয় সম্পর্কে কথা বলতে চাই, যা আমাদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, যে ভয় আমাদের অস্তিত্বকে ধীরে ধীরে বিলীনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ভারতের মুসলমানরা যেসব বিষয়ে ভয় অনুভব করেন, তা নিয়ে কথা বলব। কারণ এই ভয় শুধু মুসলিমরাই অনুভব করেন তা নয়, একই ধরনের ভয় ভারতের অন্য সংখ্যালঘুদের মধ্যেও আছে, যাদের অবস্থান একেবারেই প্রান্তিক। এমনকি এটি সংখ্যাগরিষ্ঠদের অনেকের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।’

রাখশান্দা বলেন, ‘আমি একটি ভয়াবহ ভয়ের কথা উল্লেখ করতে চাই, যা এখনো আমাকে চরমভাবে আতংকিত করে তোলে, দম বন্ধ করা পরিবেশ সৃষ্টি করে। বর্তমানে আমার শিক্ষাদীক্ষা, আমার দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, সুযোগ-সুবিধা, উচ্চপদের বন্ধু-বান্ধব— এত কিছুর পরও আমি সেই ভীতিকর পরিস্থিতি থেকে বের হতে পারিনি। আমার এ ভয় গত কয়েক বছর ধরে প্রায় স্থায়ী একটি হতাশায় রূপ নিয়েছে, যা অনেকটা হালকা তাপমাত্রার জ্বরের মতো, যা দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে ব্যাহত না করলেও স্বস্তি দিচ্ছে না। এর উপস্থিতি সবসময় বিদ্যমান, যে ভয় নিজের অস্তিত্বকে ধীরে ধীরে বিলীন করে দিয়ে দুঃখবোধ ও হতাশার দিকে চালিত করছে।

তবে লেখকের মতে, তিনি একা নন, ভারতের শহুরে অনেক মুসলিমের মধ্যেও এই ভয় এবং হতাশা দেখা যাচ্ছে। তারা এদেশের রাজনৈতিক বিতর্কে মোটেও অংশগ্রহণে আগ্রহী নন, এক্ষেত্রে পুরোপুরি নীরব। তাদের এই নীরবতা স্কুল এবং কলেজ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোর পাশাপাশি আরডব্লিউএ/হাউসিং সোসাইটি গ্রুপ চ্যাট সবখানেই দৃশ্যমান।

সাম্প্রতিক কিছু সাম্প্রদায়িক ক্ষোভ বা নৃশংসতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা এবং তা আবার মুছে দেওয়ার বিষয়টি এই নীরবতাকেই প্রকটভাবে প্রকাশ্যে এনেছে। যেকোনো ধরনের সহিংসতার ঘটনা থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করেন তারা। হোক তা একজন মুসলিম পুরুষ তার হিন্দু বান্ধবীকে হত্যা করে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলেছে সেই ঘটনা কিংবা একজন মুসলিম পুরুষ তার অমুসলিম সঙ্গীকে ব্যবসায়িক বিরোধে হত্যা করেছে সেই ঘটনাও। এক্ষেত্রে অপরাধী হচ্ছেন একজন মুসলিম।

লেখক মনে করেন, যদি তার মতো উচ্চ স্তরে থাকা একজন মানুষ এতটা ভয় ও হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত থাকেন, তাহলে দারিদ্র্য এবং নিরক্ষর মুসলিমদের ভয় ও হতাশা তো আরো বেশি। কারণ সেসব প্রান্তিক মুসলিমের তার মতো সুরক্ষা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। যেখানে আমাদের মতো মানুষদের সুরক্ষিত কমিউনিটি থাকে, সেখানে তাদের কিছুই নেই।

দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে তাদের মিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, রঙমিস্ত্রি, ছুতোর, গৃহপরিচারিকা এবং বিভিন্ন পরিসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে নিম্ন বেতনের কাজ করতে হয়। জীবনের মায়ায় তারা নিজেদের কর্মস্থলে ‘মুসলিম’ পরিচয় দেন না। তাদের ভয় মুসলিম পরিচয় প্রকাশ হলে কাজ নাও মিলতে পারে। সবজি বিক্রেতার মতো মুসলিমরা বাধ্য হয়ে নিজের সবজি ভ্যানের সামনে গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে নেন। এছাড়া বিরিয়ানি বিক্রেতা, কাবাব বিক্রেতা, লেপ প্রস্তুতকারক, গাড়ির মেকানিক—যারা ঐতিহ্যগতভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই পেশাগুলোতে আছেন, তারাও এখন জীবন নিয়ে শংকিত। লেখক সংশয় প্রকাশ করে বলেন, ইমাম এবং নায়েব ইমামদের কী হবে, যারা দরিদ্র পরিবারের সন্তান এবং হিন্দু অধ্যুষিত এলাকার মসজিদগুলোতে দায়িত্ব পালন করেন।

‘আমি দেখতে মুসলমানদের মতো নয় বলে আমি অনেক নিরাপদে চলাচল করতে পারি’— এমনটাই বলেন লেখক রাখশান্দা। যতক্ষণ পর্যন্ত আমার নাম প্রকাশ না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি নিরাপদ, কিন্তু নাম কীভাবে গোপন রাখা যাবে? পরিচয়ের অন্যতম পূর্বশর্তই হলো নাম প্রকাশ। যদিও নামের প্রথম অংশ আমাকে কিছু সুবিধা এনে দেবে, কিন্তু পরের অংশ তো মুসলিম। নতুন ভারতে যেভাবে মুসলিমদের নিয়ে উত্তেজনা শুরু হয়েছে, সেখানে যদি মুসলিম রক্তের জন্য তৎপর একদল জনতা আমাকে ঘেরাও করে, তখন আমার অবস্থা কী হবে? আমার সব তথাকথিত সুযোগ-সুবিধা লুটেরাদের ভিড়ে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আর এসব ভাবনা আমাকে ভীত করে তোলে।

সূত্র: রাখশান্দা জলিল একজন ভারতীয় লেখক, অনুবাদক এবং ইতিহাসবিদ। তার লেখা থেকে সংক্ষিপ্ত অনুবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *