জাতীয়সর্বশেষ

রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট

নিজস্ব প্রতিবেদক

এনভিবিডি24ডটকম

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বাংলাদেশ এখন গণতন্ত্রের সূর্যোদয়ের পথে। নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম ধাপ। আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি বহুল প্রত্যাশিত সেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ঐতিহাসিক এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। আর এই নির্বাচিত সরকারের দেশ পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশ গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম ধাপ পার করবে।

বাংলাদেশ দীর্ঘ দুই দশক ধরে গণতান্ত্রিক শাসন থেকে বঞ্চিত ছিল। ২০০৬ সালে ১/১১-এ সেনাসমর্থিত মইন-ফখরুদ্দিনের জরুরি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশ কার্যত গণতন্ত্রহীন হয়ে পড়ে। জরুরি সরকার দেশকে বিরাজনীতিকরণের পথে নিয়ে যায়। ২০০৮ সালে জরুরি সরকারের অধীনে যে নির্বাচনটি হয়, সেটি ছিল ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর একটি নির্বাচন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিজেই বলেছিলেন, ১/১১-এর সরকারটি ছিল তাদের আন্দোলনের ফসল। আর আন্দোলনের ফসল সরকারটি ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে ‘৮৭ শতাংশ ভোটে’ বিজয়ী ঘোষিত হয়, যা ছিল অবাক করার মতো ঘটনা। ওই নির্বাচনটিতে কোনো কোনো কেন্দ্রে ১০০ শতাংশ ভোটও দেখানো হয়। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা দেশে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেন।

তার শাসনে গণতন্ত্রকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত হয়। সুশাসনকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। নির্বাচনি ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে হয় ‘বিনা ভোটের নির্বাচন,’ ২০১৮ সালে হয় ‘নিশি রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালে হয় ‘ডামি নির্বাচন’। নির্বাচনের নামে এগুলো ছিল প্রহসন এবং দেশের জনগণের সঙ্গে তামাশা। শেখ হাসিনা দেশে  কর্তৃত্ববাদী অপশাসন চালান। তিনি এমন কৌশল ও নীলনকশা প্রণয়ন করেন যাতে তার ক্ষমতায় চিরস্থায়ী হয়।

কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ৩৬ দিনের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে তার ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হয় এবং শেখ হাসিনা দলবলসহ ভারতে পালিয়ে যান। সফল জুলাই অভ্যুত্থানের পর নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। গত দেড় বছর এই সরকারের নিরলস প্রচেষ্টার পর ১২ ফেব্রুয়ারি প্রত্যাশিত নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে।

ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে একটি ইতিহাসসেরা নির্বাচন অনুষ্ঠান করে দেশকে গণতন্ত্রে ফিরিয়ে আনবেন। গতকালও জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি হতে যাচ্ছে সারা জাতির বহু আকাঙ্ক্ষিত দিন। এই নির্বাচনটি হবে গণতান্ত্রিক যাত্রার একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের সাফল্যের পর গণতান্ত্রিক উত্তরণের যুগসন্ধিক্ষণে আমরা দাঁড়িয়ে আছি।

সংসদ নির্বাচন ও গণভোট

আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে সাংবিধানিক গণভোটের মাধ্যমে দেশ একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে যাত্রা শুরু করবে। নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল অংশ নিচ্ছে। এই নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী প্রধান দুই প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসন, গুম ও গণহত্যা চালানোর জন্য আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় তারা নির্বাচন করতে পারছে না। তাই নির্বাচনে নৌকা প্রতীকও নেই। নির্বাচন কমিশন ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে একটি পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে দেশে এক ধরনের ‘ঈদের আমেজ’ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে সরকার ও নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ভোটারদের স্বাচ্ছন্দ্যে বাড়ি গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দিতে ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সরকারি দুটি ঘোষণা করে শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে চারদিনের ছুটির ব্যবস্থা হয়েছে। রাজধানীর বাসটার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশনে ঈদে বাড়ি ফেরার মতো মানুষের ভিড় দেখা যাচ্ছে। তারা গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন ভোট দিতে। দীর্ঘ ১৫ বছর পর অনেক ভোটার বিশেষ করে তরুণরা প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত।

নির্বাচন কমিশন ক্যারাভ্যান বা ভ্রাম্যমাণ বাহনের মাধ্যমে প্রচার করার সুযোগ দিয়ে নির্বাচনি আমেজ বাড়িয়ে তুলেছে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার জন্য এক লাখ সেনাবাহিনীসহ ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করেছে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রচারকে এক কথায় বলতে গেলে এটি ছিল নজিরবিহীন উৎসবমুখর ও ডিজিটালনির্ভর। এবারের প্রচারের সবচেয়ে বড় দিক ছিল ফেসবুক, ইউটিউব এবং টিকটকের ব্যবহার। কোনো প্রকার বড় ধরনের সহিংসতা কিংবা বিশৃঙ্খলা ছাড়াই প্রার্থীরা তাদের প্রচার শেষ করেছেন। আসন্ন নির্বাচনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে কয়েকটি কারণে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এবং একটি ‘ঐতিহাসিক মোড়’ হিসেবে বিবেচিত। এবারই প্রথম একই দিনে সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’ বা সংবিধান সংস্কারের ওপর একটি জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভোটাররা দুটি ভিন্ন রঙের ব্যালট পেপার (সংসদ নির্বাচনের জন্য সাদা এবং গণভোটের জন্য গোলাপি) ব্যবহার করবেন। গত তিনটি প্রহসনের নির্বাচনের পর এটিই প্রথম বড় ধরনের অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এবারের নির্বাচনে প্রায় ৪ কোটি তরুণ ভোটার রয়েছেন। যারা মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশ। কেন্দ্রে সিসিটিভি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ২৫ হাজার ৭শ ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ রয়েছে। প্রায় এক হাজার ড্রোন ভোটকেন্দ্রে নজরদারি করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *