রাজনীতিসর্বশেষ

জয়শঙ্কর ও আইয়াজের ঢাকা সফর:ভবিষ্যত সরকারের পাশে থাকার ইঙ্গিত

ছবি:সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক

এনভিবিডি24ডটকম

০২ জানুয়ারি, ২০২৬

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজার ঠিক আগ মুহূর্তে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাক্ষাৎকে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের অংশ হিসাবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ভূরাজনৈতিক দিক থেকে এটিকে নতুন ইঙ্গিতও মনে করা হচ্ছে। তারেক রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানের স্পিকার আইয়াজ সাদিকের সাক্ষাৎও সেই বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের এ সাক্ষাৎকে সব বিবেচনায় ইতিবাচক হিসাবেই দেখছে কূটনৈতিক মহল। এদিকে ভারতের কূটনীতিকের সঙ্গে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের বৈঠকটিও আলোচনায় আছে। পুরো বিষয়গুলো এমনও ইঙ্গিত করছে যে বাংলাদেশে আগামীতে যে দলই সরকার গঠন করুক ভারত ও পাকিস্তান তাদের সঙ্গে আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের যে অবনতি ঘটেছে তা অদূর ভবিষ্যতে নতুনভাবে তৈরি হবে বলেও আশা করা হচ্ছে।

হাসিনার পতনের পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে মরিয়া পাকিস্তান। ভারতের কূটনীতিকের সঙ্গে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের বৈঠকটি মূলত ডিপ্লোম্যাসি টু অর্থাৎ সিক্রেসির অংশ। তারপরও দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন দেশের আলাপ-আলোচনা, বৈঠক ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বুধবার ঢাকায় আসেন জয়শঙ্কর। তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা তুলে দেন। পাশাপাশি তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন। একই ভাবে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার আইয়াজ সাদিক সে দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, ফিল্ড মার্শালের পক্ষে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গভীর শোক জানান।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, খালেদা জিয়ার জানাজায় ভারত-পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরত্বপূর্ণ মন্ত্রী, কূটনীতিকদের আগমন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সব দেশই তার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সবাই এসেছেন। এটি কূটনৈতিক শিষ্টাচারের অংশ। তারেক রহমানের সঙ্গে ভারত-পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের বৈঠক, ভারতের কূটনীতিকের সঙ্গে জামায়াত আমিরের বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুরো বিষয় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে এ অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে দেখা হচ্ছে। তাই সব দেশই বাংলাদেশের অবস্থা বুঝতে আগ্রহী, কাজ করতে আগ্রহী। ভবিষ্যতে যে সরকারই আসুক তা একই রকম থাকবে। এটি ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রচ্ছন্নভাবে আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়, বাংলাদেশে সম্ভাব্য কারা ভবিষ্যতে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করতে পারে তাদের সঙ্গে দেশগুলো যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলে সেটিও ইতিবাচক।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন, দেড় বছর ধরে বাংলাদেশে একটি অন্তর্বর্তী সরকার আছে। অনেক দেশ তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বিনির্মাণে এগিয়ে আসেনি। কারণ, তারা সরকারের গতি-প্রকৃতি নিয়ে নিশ্চিত ছিল না। সামনে নির্বাচন। এখন বিশ্বের অনেক দেশ বাংলাদেশের সম্ভাব্য ক্ষমতাসীনদের বোঝাতে চাইছে যে, তারা পাশে আছে। এসব দেশ সবকিছু অবজারভ করছে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সে কারণে কোনো রাষ্ট্রের দূত পাঠানো বা শোকবার্তা হস্তান্তর স্বাভাবিক বিষয়। নির্বাচন সামনে রেখে মনে করা হচ্ছে, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দল বিএনপি আগামী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। হয়তো সরকারও গঠন করতে পারে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ভারত, পাকিস্তান বা অন্য দেশগুলো বার্তা দিচ্ছে যে, আমরা তোমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। পাশাপাশি বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে বা ক্ষমতার জায়গায় একটি ভূমিকা রাখে তার সঙ্গেও আছি। অন্যদিকে ভারতের দুইজন কূটনীতিকের সঙ্গে জামায়াতের বৈঠকও অস্বাভাবিক নয়। যে কোনো রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে চিন্তা করে। তারা ক্ষমতায় যাক বা না যাক পররাষ্ট্রনীতি সবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সে হিসাবে জামায়াতের সঙ্গে মতবিনিময় হতেই পারে। সাধারণত মতবিনিময় করলে সেটা রাজনৈতিক দল প্রকাশ করে। কিন্তু জামায়াত দীর্ঘদিন তাদের অনেক কার্যক্রম প্রকাশ করেনি। হয়তো এই প্র্যাকটিস তাদের মধ্যে ঢুকে গেছে। এখন ভারতের সঙ্গে তাদের আলোচনার কথা শুনেছি। আরও হয়তো অনেকের সঙ্গে তারা কথা বলেছেন যেটি আমরা শুনিনি বা জানি না।

বাংলাদেশে যে সরকারই আসুক প্রতিবেশী দেশ হিসাবে ভারত, মিয়ানমার এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। পাশাপাশি ইন্দো-প্যাসিফিকের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসাবে দেশের পরবর্তী সরকার কোন দেশের সঙ্গে কি ধরনের সম্পর্ক নির্মাণ করবে তা বিশ্বের শক্তিধর নানা দেশ পর্যবেক্ষণ করছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, ভারত সার্বক্ষণিকভাবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সাউথ ব্লক থেকে এমনও কথা এসেছে যে, তারা নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করছে। অন্তর্বর্তী সরকারকে তারা গণ্য করছে না। সেদিক থেকে তাদের কাজ গোছানোর জন্য ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বাংলাদেশকে নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে। কে কত বাংলাদেশের কাছে যেতে পারে। পাকিস্তানের জন্য নতুন একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে গণ-অভ্যুত্থানের পরে। তারা সে সুযোগ হেলায় হারাতে চায় না। তিনি বলেন, ভৌগোলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশে যে সরকারই আসুক না কেন ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমারসহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ‘মিনিমাম’ সম্পর্ক রক্ষা করেই চলতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকে বিএনপিকে বলছেন, ‘গভর্নমেন্ট ইন ওয়েটিং’। অন্যদিকে, জামায়াতের জন্য প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। তাদেরও ভারতের আধিপত্য অস্বীকার করা কঠিন হবে। তারা বুদ্ধিমানের কাজ করেছে যদি ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকে। স্বাভাবিকভাবে বুঝি, ভারত কখনো চাইবে না বাংলাদেশে ইসলামি একটি শক্তি ক্ষমতাসীন হোক। জামায়াত হয়তো সবার জন্য তাদের জানালা খোলা রাখতে চায়। ডিপ্লোম্যাসি টু হলো সিক্রেসি। সেটি ব্যবহার করে যদি তারা যোগাযোগ রক্ষা করে থাকে তাহলে উভয়ের দিক থেকেই তা বাস্তবসম্মত এবং কৌশলগতভাবে সঠিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *