জাতীয়সর্বশেষ

ভারতের পানি আগ্রাসন রোধে নির্মিত হচ্ছে বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা ব্যারাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক

এনভিবিডি24ডটকম

১৫ মে, ২০২৬

বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের তৃতীয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় জনআকাঙ্ক্ষার এ প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে বুধবার।

প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি টিমের মতামত অনুযায়ী ধাপে ধাপে এ প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ দেবে সরকার। প্রথম ধাপে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার।

একনেকে এ প্রকল্প অনুমোদনের খবরে পরিবেশবিদসহ দেশের সব শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের মধ্যে খুশির আবহ তৈরি হয়েছে। মরণফাঁদ হিসেবে চিহ্নিত ভারতের ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের বিশাল ভূখণ্ড শুকিয়ে মরুময়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে। ভারতের পানি আগ্রাসনের শিকার হয়ে আমাদের জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হওয়ার পথে। মৎস্য ও কৃষিজাত অর্থনীতিও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। শুকনো মৌসুমে পদ্মা শুকিয়ে ধু-ধু বালুচর। এমন পরিস্থিতিতে পদ্মা ব্যারাজ বাংলাদেশের জনমানুষের জন্য এক অনন্য আশীর্বাদ হিসেবে আসবে, এমন প্রত্যাশা পরিবেশবিদদের।

শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলেও এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে ভারতের প্রবল আপত্তির কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি, এমন তথ্যও উঠে এসেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে। বুধবার প্রকল্পটি অনুমোদনের পর পানিসম্পদ মন্ত্রীর কাছে একজন সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল—এ প্রকল্পের বিষয়ে ভারত সরকারের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না? সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘এটি আমাদের জীবন-মরণ সমস্যা। পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের বিষয়টি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটি বাস্তবায়নে ভারতের অনুমতি নেওয়ার প্রসঙ্গ আসবে কেন?’

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ভারতের পানি আগ্রাসনে বিধ্বস্ত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৬ জেলার ১২৩ উপজেলার জীববৈচিত্র্যের প্রাণ ফেরানোর জন্য ৫০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকায় প্রকল্পটি নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ওই আমলে এটি চূড়ান্ত অনুমোদন না দিয়ে নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে যায় ওই সরকার। ওই সময় পানিসম্পদ উপদেষ্টাও জানিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক সনদ, রীতিনীতি ও আইন লঙ্ঘন করে ভারত যেভাবে দুই দেশের অভিন্ন নদীগুলো থেকে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের কৃষিসহ পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা টাকার অঙ্কে নিরূপণযোগ্য নয়। এ অবস্থায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন খুবই জরুরি। আমরা চাই একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার এসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিক।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের আদি কথা

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এসব নদীতে প্রবাহিত পানির ন্যায্য হিস্যা উভয় দেশই প্রাকৃতিক নিয়মে পেয়েছে। ১৯৬০ সালের দিকে ভারত গঙ্গাসহ কয়েকটি নদী থেকে আইন অমান্য করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার শুরু করে। পরের বছরই পূর্ব পাকিস্তান পানি উন্নয়ন বোর্ড – ইপওয়াপদা (বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ড, পাউবো) পদ্মার পানির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে ভারতের পানি আগ্রাসন মোকাবিলার বিষয়ে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। ২০০২ সালে দেশের পানিসম্পদের সামষ্টিক পরিকল্পনাকারী সংস্থা ওয়ারপো কুষ্টিয়া অথবা রাজবাড়ী জেলায় এ-সংক্রান্ত ব্যারাজ নির্মাণের সুপারিশ করে। এ নিয়ে প্রকল্পের বিষয়ে দাপ্তরিক কাজ বেশ কিছুদূর এগোয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিস্তৃত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকৌশল নকশা প্রণয়ন করা হয়।

প্রকল্পে ভারতের আপত্তি

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভারতের পানি প্রত্যাহারের ফলে দেশের কৃষিসহ জীববৈচিত্র্যে মারাত্মক প্রভাব পড়তে থাকলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারও প্রকল্পটি নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এ বিষয়ে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনার একপর্যায়ে ২০১৬ সালের অক্টোবরে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন শেষে ঢাকায় বৈঠক করেন। পরে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি যৌথ কারিগরি উপকমিটিও গঠন করা হয়। একপর্যায়ে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকসহ দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোয় এ প্রকল্প নিয়ে ভারত প্রবল আপত্তি দেয়। ২০১৮ সালে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এ-সংক্রান্ত নথিগুলো হিমাগারে নথিজাত করে রাখে বলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফারাক্কার ক্ষতি মোকাবিলায় ব্যারাজটি নির্মাণ জরুরী

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো নথিতে আরো বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালে ভারত পদ্মা নদীতে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু করে এর প্রবাহ একতরফাভাবে ভাগীরথী নদীর মাধ্যমে হুগলি নদীতে প্রত্যাহার করে, যা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এক ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করে।

ফারাক্কার মাধ্যমে ভারতের পানি প্রত্যাহারে বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা দিয়ে নথিতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, পদ্মানির্ভর এলাকা দেশের মোট আয়তনের প্রায় ৩৭ শতাংশ। এখানে বাস করে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ এবং একতরফাভাবে পদ্মার পানি প্রত্যাহারের ফলে মাথাভাঙা, সাগরখালী, নবগঙ্গা, চিত্রা, কুমার, ফটকি, ভৈরব, আফ্রা, কপোতাক্ষ, হরিহর, টেকা, মুক্তেশ্বরী, বেতনা নদী গঠিত হিসনা-মাথাভাঙা নদী সিস্টেম; কালীগঙ্গা, মুচিখালী, আঠারোবেঁকী, মধুমতী, রূপসা, পশুর নদী নিয়ে গঠিত গড়াই-মধুমতী নদী সিস্টেম; চন্দনা, বারাশিয়া, কুমার, পুরোনো কুমার নদী নিয়ে গঠিত চন্দনা-বারাশিয়া নদী সিস্টেম এবং বড়াল, নন্দকুঁজা, নারোদ, মুসাখান নদী গঠিত বড়াল-ইছামতী নদী সিস্টেমগুলোয় পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। পলি পতনের কারণে পদ্মা থেকে নদী সিস্টেমগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ভরাট হওয়া নদীগুলো খনন করে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পর্যাপ্ত প্রবাহ না থাকায় তা ফলপ্রসূ হয়নি। পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ না পাওয়া অধিকাংশ নদী মরে গেছে বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে উজানের প্রবাহ না থাকায় সাগর থেকে জোয়ারের সঙ্গে আসা পলি সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও যশোর এলাকার নদীগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া ত্বরান্বিত করেছে, যা নিষ্কাশনে সমস্যা সৃষ্টির পাশাপাশি অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লবণাক্ততা। ফলে এলাকাগুলোয় রয়েছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। লবণাক্ততার মাত্রা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুন্দরবনের ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানিস্তর পুনর্ভরণ না হওয়ার কারণে বরেন্দ্র এলাকায়ও রয়েছে তীব্র পানি সংকট, যা অনেক এলাকায় আর্সেনিক দূষণের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে।

১২৩ উপজেলার মানুষ বাঁচাতে এ প্রকল্প

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৬টি জেলার ১২৩টি উপজেলার সাধারণ মানুষ আশায় বুক বেঁধে বসে আছে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমগুলো হচ্ছে—মূল পদ্মা ব্যারাজ এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো (স্পিলওয়ে, আন্ডার স্লুইস, ফিশ পাস, নেভিগেশন লক, গাইড বাঁধ, অ্যাপ্রোচ এমব্যাঙ্কমেন্ট ইত্যাদি) নির্মাণ; পদ্মা ব্যারাজ-সংশ্লিষ্ট একটি ইলেকট্রিক ওয়ার্কস এবং হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ; গড়াই অফটেক মূল এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো (স্পিলওয়ে, আন্ডার স্লুইস, ফিশ পাস, নেভিগেশন লক, গাইড বাঁধ, অ্যাপ্রোচ এমব্যাঙ্কমেন্ট ইত্যাদি) নির্মাণ; গড়াই অফটেক সংশ্লিষ্ট ইলেকট্রিক ওয়ার্কস এবং হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ; চন্দনা ও হিসনা অফটেক অবকাঠামো নির্মাণ; গড়াই-মধুমতী নদী ড্রেজিং, হিসনা-মাথাভাঙা নদী সিস্টেম পুনঃখনন ও এফ্ল্যাক্স বাঁধ নির্মাণ।

এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য জুলাই পর্যন্ত ব্যারাজ রিজার্ভার অবস্থায় থাকবে। পানি সমতল থেকে আট মিটার নেমে গেলে মধ্য অক্টোবর থেকে ব্যারাজে পানি সংরক্ষণ শুরু হবে। ১০-১৫ দিনেই রিজার্ভারের পানি সমতল ১২ দশমিক ৫ মিটারে উন্নীত করা সম্ভব হবে। সীমান্তে লা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *